বয়স তখন ছিল কাঁচা, হালকা দেহখানা
ছিল পাখির মতো, শুধু ছিল না তার ডানা।
উড়ত পাশের ছাদের থেকে পায়রাগুলোর ঝাঁক,
বারান্দাটার রেলিঙ-’পরে ডাকত এসে কাক।
ফেরিওয়ালা হেঁকে যেত গলির ওপার থেকে
তপসিমাছের ঝুড়িখানা গামছা দিয়ে ঢেকে...
আজ থেকে ১৬২ বছর আগে কলকাতায় জন্ম বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। আজকের শহর কলকাতা আর তখনকার কলকাতার মধ্যে নিশ্চয় অনেক তফাত ছিল। আজকের দিনের শিশুদের পড়াশোনা, খেলাধুলা, অবসরযাপন ইত্যাদির সঙ্গে তখনকার শিশুদের সময় কাটানোর অনেক অমিল ছিল। এসো জেনে নেওয়া যাক কেমন ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলেবেলা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন জন্ম নিয়েছিলেন তখন কলকাতা শহরে শ্যাকরাগাড়ি ছুটে চলত ছড়ছড় করে ধুলো উড়িয়ে। দড়ির চাবুক পড়ত হাড়-বের-করা ঘোড়ার পিঠে। না ছিল ট্রাম, না ছিল বাস, না ছিল মোটরগাড়ি। তখন কাজের এত হাঁসফাঁস ছিল না। বাবুরা অফিসে যেতেন পান চিবুতে চিবুতে। কেউ পালকি চড়ে, কেউবা ভাগের গাড়িতে। তখন শহরে না ছিল গ্যাস, না ছিল বিজলি বাতি। কেরোসিনের আলো যখন এলো তার তেজ দেখে সবাই তো অবাক। সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ঘরে জ¦ালিয়ে দেওয়া হতো রেড়ির তেলের আলো। রবীন্দ্রনাথদের পড়ার ঘরে জ¦লত দুই সলতের একটা প্রদীপ।
সেই মিটমিটে আলোয় মাস্টারমশায় তাদের পড়াতেন প্যারী সরকারের ফার্স্ট বুক। পড়তে বসলে বালক রবীন্দ্রনাথের প্রথমে হাই উঠত, তারপর আসত ঘুম, তারপর চলত চোখ রগড়ানি। মাস্টারমশায় বারবার বলতেন, তার অন্য সব ছাত্র সোনার টুকরো। পড়ায় তাদের আশ্চর্য মন, ঘুম পেলে চোখে নস্যি ঘষে। আর রবীন্দ্রনাথ? সব ছেলের মধ্যে তাকে একলা মূর্খ হয়ে থাকতে হবে, এমন ভয় দেখিয়েও তাকে জাগিয়ে রাখা যেত না। রাত নয়টা বাজলে ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখে ছুটি পেতেন তিনি।
তখন বিদ্যুতের আলো ছিল না বলে ভেতরবাড়ি আর বাহিরবাড়ি আলোয় ঝলমল করত না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আঁধার ঘনিয়ে আসত। আর অন্ধকার মানেই ভূতের ভয়। সেই ভয় থেকেই ডালপালা গজাত নানান ভূতের গল্পের। ঠাকুরবাড়ির কোনো এক দাসী হয়তো হঠাৎ শুনতে পেত শাঁকচুন্নির নাকিসুর। শুনে দড়াম করে পড়ত আছাড় খেয়ে। ওই মেয়ে ভূতটা ছিল সবচেয়ে বদমেজাজি, তার লোভ ছিল মাছের ওপর। বাড়ির পশ্চিম কোণে ঘন পাতাওয়ালা বাদামগাছের ডালে এক পা আর অন্য পা তেতলার কার্নিশের ওপর তুলে দাঁড়িয়ে থাকত ভূতটা। তাকে দেখেছে বলে অনেকেই দাবি করত। আর সে দাবি মেনে নেওয়ার লোকেরও অভাব হতো না। রবীন্দ্রনাথের দাদার এক বন্ধু যখন এসব গল্প হেসে উড়িয়ে দিতেন, তখন চাকররা মনে করত, লোকটার ধর্মজ্ঞান নেই একটুও। দেবে একদিন ঘাড় মটকিয়ে, তখন বিদ্যে যাবে বেরিয়ে। এসব ভূতের ভয় নিয়ে যখন বাড়ির ভেতরের বাগানে যেতেন রবীন্দ্রনাথ বা তার মতো ছোট ছেলেরা, তখন তাদের বুকের ভেতর তোলপাড় করে উঠত, এই বুঝি সেই শাঁকচুন্নি এসে ঘাড় মটকে দিল!
রবীন্দ্রনাথের দাদাকে পদ্মা থেকে ইলিশ মাছ আর কচ্ছপের ডিম এনে দিত আবদুল মাঝি। বালক রবীন্দ্রনাথকে সে শোনাত অদ্ভুত অদ্ভুত সব গল্প। একদিন সে গল্প করছিল-মাসের শেষে ডিঙিতে মাছ ধরতে গেছি। হঠাৎ এলো কালবৈশাখী। ভীষণ তুফান, নৌকা ডোবে ডোবে। দাঁতে রশি কামড়ে ধরে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতরে উঠলাম চরে। কাছি ধরে টেনে তুললাম ডিঙি।
গল্পটা এত তাড়াতাড়ি শেষ হলো, পছন্দ হলো না রবীন্দ্রনাথের। তিনি বললেন, তারপর?
আবদুল বলল, তারপর সে এক কা-। দেখি, এক নেকড়ে বাঘ। ইয়া তার গোঁফজোড়া। ঝড়ের সময় সে উঠেছিল ওপারে গঞ্জের ঘাটের পাকুড়গাছে। দমকা হাওয়া যেমনি লাগল, গাছ ভেঙে পড়ল পদ্মায়। বাঘ ভায়া ভেসে যায় জলের তোড়ে। খাবি খেতে খেতে উঠল এসে চরে। তাকে দেখেই আমার রশিতে লাগালুম ফাঁস। জানোয়ারটা এত্ত বড় বড় চোখ পাকিয়ে দাঁড়াল আমার সামনে। সাঁতার কেটে তার জমে উঠেছে খিদে। আমাকে দেখে তার লাল টকটকে জিভ দিয়ে নাল ঝরতে লাগল। বাইরে-ভিতরে অনেক মানুষের সঙ্গে তার চেনাশোনা হয়ে গেছে কিন্তু আবদুলকে সে চেনে না। আমি ডাক দিলুম, আও বাচ্ছা। সে সামনের দুপা তুলে পাড়ে উঠতেই দিলুম তার গলায় ফাঁস আটকিয়ে, ছাড়াবার জন্য যতই ছটফট করে ততই ফাঁস এঁটে গিয়ে তার জিভ বেরিয়ে পড়ে।
এ পর্যন্ত শুনে রবীন্দ্রনাথ বলে উঠলেন, মরে গেল নাকি সে?
আবদুল বলল, মরবে তার বাপের সাধ্যি কী? নদীতে বান এসেছে। বাহাদুরগঞ্জে ফিরতে হবে তো! ডিঙির সঙ্গে জুড়ে বাঘের বাচ্ছাকে দিয়ে গুণ টানিয়ে নিলেম অন্তত বিশ ক্রোশ রাস্তা। গোঁ গোঁ করে উঠলেই পেটে দিই দাঁড়ের খোঁচা, দশ-পনেরো ঘণ্টার রাস্তা দেড় ঘণ্টায় পৌঁছিয়ে দিল। তার পরের কথা জিজ্ঞেস কোরো না বাবা, জবাব মিলবে না।
তার পরের কথা আর জিজ্ঞেস করলেন না রবীন্দ্রনাথ। বুঝলেন, গল্প আর টেনে নিতে পারছে না আবদুল। পড়ায় ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টায়ও কমতি ছিল না রবীন্দ্রনাথের। তবে ছোটবেলা থেকেই তার শরীর এত ভালো ছিল যে জোর করেও অসুখ বাঁধাতে পারতেন না। জুতো জলে ভিজিয়ে ঘুরে বেড়াতেন সারা দিন কিন্তু সর্দি হতো না। কার্তিক মাসে খোলা ছাদে শুয়ে থাকতেন, চুল জামা যেত ভিজে কিন্তু গলার মধ্যে একটু খুসখুসানি কাশিরও সাড়া পেতেন না। পেট কামড়ানি বলে ভেতরে ভেতরে বদহজমের যে একটা তাগিদ পাওয়া যায়, সেটা কেমন তা কোনোদিন টের পাননি, তবু মায়ের কাছে আবদার জানাতেন, পেটে ব্যথা, আজ পড়তে বসব না। শুনে মা মনে মনে হাসতেন, একটুও ভাবতেন না যে ছেলের অসুখ। শুধু চাকরকে ডেকে বলে দিতেন, মাস্টারকে জানিয়ে দে, আজ আর পড়াতে হবে না।
একদিন ঠাকুরবাড়িতে ডাকাতের খেলা দেখানো হয়েছিল। মস্ত কালো কালো জোয়ান সব, লম্বা লম্বা চুল। ঢেঁকিতে চাদর বেঁধে দাঁতে কামড়ে ধরে টান দিয়ে সেটা পিঠের দিকে নিয়ে গেল। ঝাঁকড়া চুলে মানুষ দুলিয়ে ঘোরাতে লাগল। লম্বা লাঠির ওপর ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠল দোতলায়। একজনের দুই হাতের ফাঁক দিয়ে পাখির মতো সুট করে বেরিয়ে গেল। দশ-বিশ ক্রোশ দূরে ডাকাতি সেরে সেই রাতেই ভালোমানুষের মতো ঘরে ফিরে এসে শুয়ে থাকা কেমন করে হতে পারে, তাও দেখাল। খুব বড় একজোড়া লাঠির মাঝখানে আড়-করা একটা করে পা রাখার কাঠের টুকরো বাঁধা, এই লাঠিকে বলে রঙপা। দুই হাতে দুই লাঠির আগা ধরে সেই পাদানির ওপর পা রেখে চললে এক পা ফেলা দশ পা ফেলার সমান হতো, ঘোড়ার চেয়ে দৌড় হতো বেশি। ডাকাতি করার মতলব যদিও মাথায় ছিল না তবু একসময়ে এই রঙপায় চলার অভ্যাস শান্তিনিকেতনের ছেলেদের মধ্যে চালাবার চেষ্টা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
কী মজার ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটবেলা তাই না? জানতে চাইবে না, আমি এতসব জানলাম কোথা থেকে? জানলাম তার লেখা ‘ছেলেবেলা’ বইটি পড়ে। তোমরা যদি তার ছোটবেলার আরও মজার মজার ঘটনা জানতে চাও তা হলে পড়ে দেখতে পারো তার লেখা ‘ছেলেবেলা’ আর ‘জীবনস্মৃতি’।




Comments