Image description

‘সাম্যবাদী’ কাজী নজরুল ইসলামের এমন এক কাব্যগ্রন্থ, যেখানে তিনি তাঁর লেখকজীবনের অভীষ্ট আনয়ন করেছেন। তাঁর অপরাপর সৃষ্টির জগতে যে জীবনবাদী স্বকীয় চরিত্র উন্মোচিত হয়েছে, তার সূচকসমূহ এখানে দীপ্যমান হয়ে আছে। জীবনের সব স্তরের বৈষম্য দূরীকরণের এক অমোঘ দিকনির্দেশনা এই কাব্যগ্রন্থ। ১১টি কবিতায় আলাদা আলাদা বিষয়ের ওপর আলো ফেলা হলেও তা জীবনের সমন্বিত রূপ হয়ে উঠেছে।

কবির জীবন যখন চরমতম ঘটনাবহুল হয়ে উঠেছে, সেই সময়ে ২০২৫ সালে ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। “১৯২২ সালে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা ও অন্য লেখকের একটি রচনার জন্য সম্পাদক নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা। কুমিল্লায় নজরুল গ্রেফতার। ১৯২৩ সালের জানুয়ারি মাসে বিচারে নজরুলকে এক-বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জেল থেকে মুক্তি পান ঐ বছরের ডিসেম্বর মাসে।” 

জেল থেকে বের হয়েও তিনি ছিলেন অবদমিত। কোনো ভীতির কাছে তিনি নত হননি। বারবার তিনি প্রতিবাদের-প্রতিরোধের উচ্চারণকে বাধাহীন করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন।

শতবর্ষ পেরিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির কাবা নাই’ কিংবা ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্’—চরণ দুটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের। এই কাব্যগ্রন্থের সব কবিতার পঙিক্তমালা এ রকম সামাজিক দায়বদ্ধতা উৎসারিত। সমকালীন প্রথাগত-প্রচলিত অন্তঃসারশূন্য বিশ্বাসের মূলেও তিনি কুঠারাঘাত করেছেন। স্থান-কাল-নিরপেক্ষ সত্যবচনে তিনি পৌঁছতে চেয়েছেন। ধর্মের নামে, বর্ণের নামে, শ্রেণির নামে, নারী-পুরুষ বিবেচনায় মানুষের যে প্রথাগত অসার ধারণা ছিল, সেগুলোর বিপরীতে কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’ কালজয়ী সৃষ্টি।

প্রথাবিরোধিতার কারণে প্রথাবাদীদের দ্বারা তাঁকে সমালোচিত হতে হয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার শোষণের জাঁতাকলে যখন ভারতবর্ষ পিষ্ট, তখন ব্রিটিশদের দোর্দণ্ড প্রতাপের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবিতে যুক্তিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তিনি।

‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতায় তিনি জগতের সব ধর্মের বিভেদ দূর করার কথা বলেছেন। ধর্মীয় বিভেদরেখা মানুষে-মানুষে দূরত্ব রচনা না করলেও প্রথাগতদের কাছে সেটি হয়ে উঠেছিল। কবি চেয়েছেন মানুষের জয়গান। তিনি এমন এক সময় মানুষের জয়গান গেয়েছেন, যখন কার্যত শাস্ত্রের প্রাধান্য ছিল অসীম। শাস্ত্রকে বুদ্ধি দিয়ে তখনো পূর্ণরূপে মানুষ গ্রহণ করার সক্ষমতা অর্জন করেনি। সাধারণদের কাছে ‘মানুষ’ পরিচয়ের গুরুত্ব ছিল গৌণ। সমাজে যে কজন চিন্তকের জন্ম হয়েছিল তাঁরা সমাজকে বদলে দেওয়ার মতো প্রভাবক হয়ে উঠতে পারেননি। সেই প্রভাব ছিল বিশেষত শিক্ষিত শ্রেণির কাছে। আপামর জনসাধারণ প্রধানত সমাজপতির ওপরই নির্ভরশীল ছিল। সমাজের একটু নমুনা দেওয়া যেতে পারে; যেমন—বাংলা ভাষাকে হিন্দুয়ানি আখ্যা দিয়ে অনেকে এই ভাষাকে বরণ করতে চায়নি। ইংরেজি পাঠ তখনো কুসংস্কারের বৃত্তে বন্দি। এমনই এক সমাজবাস্তবতায় কাজী নজরুল ইসলাম বৃত্ত ভাঙার গান গেয়েছেন ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থে।

‘সাম্যবাদী’ প্রকাশের শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রচলিত বিশ্বাসের নিরিখে ধর্মকে মানুষ মূল্যায়ন করে চলছে। স্বর্গের মোহ এবং নরকের ভীতির পরিবর্তে যে স্রষ্টা-সৃষ্টির প্রেম হতে পারে, এটি এখনো গণমানুষের মধ্যে ভীষণভাবে অনুপস্থিত। সমাজে সংখ্যাধিক্যের কাছে ধর্মদর্শন এখনো স্পষ্ট নয়। ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতা শুরু হয়েছে এভাবে—‘গাহি সামের গান—/যেখানে আসিয়া এক হ’য়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,/যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসিলম-ক্রীশ্চান।’ এই মিলে যাওয়া কিংবা এক হয়ে যাওয়ার যে আহ্বান, সেখানে নিজ নিজ ধর্মকে অস্বীকার করার মাধ্যমে নয়, বরং নিজ নিজ ধর্ম বজায় রেখে মানুষের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠার কথা তিনি বলেছেন। ধর্মের নামে যে অধর্ম, সেটাই তাঁর কাছে পরিত্যাজ্য।

কাজী নজরুল ইসলামের একটি প্রবন্ধ আছে— ‘হিন্দু-মুসলমান’। সেই প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন হিন্দুর হিন্দুত্ব এবং মুসলমানের মুসলমানিত্ব প্রকট আকারে দেখা দিয়েছে দাড়িত্বে আর টিকিত্বে। দুই ধর্মের স্রষ্টার মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। যত বিভেদ ‘ত্ব’-এর মধ্যে। তিনি কট্টর যুক্তিবর্জিত ধার্মিকদের চরম সমালোচনা করেছেন। সেই প্রবন্ধের চাওয়াটাই ‘সাম্যবাদী’তে কবিতার আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয়েছে।

কাজী নজরুল ইসলামের এই কাব্যগ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ‘মানুষ’। সমাজের অবহেলিত মানুষ এই কবিতার উপজীব্য। কবি এই কবিতায় বোঝাতে চেয়েছেন মানুষ কত বড়। তুলনামূলক বিবেচনায় মানুষের অবস্থান তিনি চিহ্নিত করেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালি সমাজে প্রথমবারের মতো মানুষের জয়গান গেয়েছেন তা নয়। তাঁর কয়েক শ বছর আগে চণ্ডীদাস লিখেছিলেন—‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ ‘মানুষ’ কবিতার পরতে পরতে কাজী নজরুল ইসলাম মানুষের কথা বলেছেন। মন্দিরের পূজারি ক্ষুধাতুরকে খেতে দেয়নি, মসজিদের মোল্লা ক্ষুধাতুর ব্যক্তিকে নামাজ না পড়ার কারণে শিরনিতে বেঁচে যাওয়া ‘অঢেল’ গোস্ত-রুটি থেকে বঞ্চিত করেছে। এই দুই দৃষ্টান্তকে সামনে এনে ‘মানুষ’ কবিতায় তিনি লিখেছেন-‘পূজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,/মানুষ এনেছে গ্রন্থ; গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো!’

‘বারাঙ্গনা’ কবিতা সময় বিবেচনায় সাহসী উচ্চারণ। এক শ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো যে সত্যকে বরণ করা কঠিন, সেই সত্য তিনি অনায়াসে লিখে গেছেন কবিতায়। সমাজে সবার মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান চেয়েছেন কবি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা চরমে পৌঁছেছিল। তখন অনেক নারী নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্য দেহকে আশ্রয় করেছিল। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাদেরও সম্মান করতে চেয়েছেন। যুক্তিবিচ্ছিন্ন প্রথার গভীরে গিয়ে কবি সত্য তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থ যে সমাজ বদলে দেওয়ার হাতিয়ার, ‘বারাঙ্গনা’ কবিতায় তারই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়। কবির ভাষায়—‘শুন মানুষের চাঁই—/জারজ কামজ সন্তানে দেখি কোনো সে প্রভেদ নাই!/অসতী মাতার পুত্র যদি জারজ পুত্র হয়,/অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়!’

‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের অনেক আলোচিত কবিতা ‘নারী’। কাজী নজরুল ইসলামের কালে তো বটেই, তার আগে কিংবা সাম্যবাদী রচনার শতবর্ষ পরেও নারীর অবস্থান সমাজে সমতালের নয়। বিষম অবস্থানের বিরুদ্ধে কাজী নজরুল ইসলাম ‘নারী’ কবিতায় বিশদভাবে লিখেছেন। কবিতার শুরুতে তিনি লিখেছেন—‘সাম্যের গান গাই—/আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।/বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’

‘কুলি-মজুর’ কবিতায় তিনি শ্রমজীবী মানুষের কথা বলেছেন। ব্রিটিশশাসিত সমাজে পুঁজিবাদের বিকাশ হচ্ছিল বেশ দ্রুত। বিত্তবানের সঙ্গে বিত্তহীনের পার্থক্য নগ্নভাবে ধরা দিয়েছিল। যে শ্রমজীবী মানুষের শ্রমের বিনিময়ে সভ্যতার নির্মাণ, সেই শ্রমজীবীর অধিকার রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কবি বৈষম্যমূলক সমাজের বিনাশ চেয়েছেন—‘মহা- মানবের মহা-বেদনার আজি মহা-উত্থান,/ঊর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নিচে কাঁপিতেছে শয়তান।’

কাজী নজরুল ইসলাম যে সময়ে ‘সাম্যবাদী’ লিখেছেন তখন সমাজের অমানবিক, অসহিষ্ণু, অকল্যাণকর, সাম্প্রদায়িক, বিভেদমূলক অনেক অনুষঙ্গ ছিল। কবি সেগুলো রোধ করার আন্তরিক চেষ্টা করেছেন।

কাজী নজরুল ইসলামের অনেক গুণের মধ্যে একটি ছিল, তিনি পাঠক সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর লেখা পড়ার জন্য পাঠকরা অপেক্ষা করতেন। অপেক্ষার কারণ, তিনি যে কথা যেভাবে বলতেন তা ছিল জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এই প্রতিফলন নগ্নভাবে আর কোনো সাহিত্যে উপস্থাপিত হয়নি। তিনি লেখার আঙ্গিকের পাশাপাশি বিষয়কে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে গেছেন। সেই বিষয় ছিল মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার। মূল্যবোধের এক চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন তিনি। ফলে তাঁর লেখাগুলো অনেক সময় সমাজসংস্কারের পর্যায়ে উন্নীত। কেন তিনি আঙ্গিকের চেয়ে সমাজ পরিবর্তনে লেখাকে অবলম্বন করেছেন, সেটি নিজের ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতায় স্পষ্টত জানিয়েছেন। সেখানে একটি দিক পরিষ্কার— তিনি যতটা শিল্পী হতে চেয়েছেন, তার চেয়ে ঢের চেয়েছেন সংস্কারক হতে। কবির ভাষায়—‘পরোয়া করি না বাঁচি বা না বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে।/মাথার উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।/প্রার্থনা ক’রো—যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,/যেন লেখা হয় আমার রক্ত- লেখায় তাদের সর্বনাশ।’

সময় গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজ থেকে কুসংস্কারের আস্তরণ খুলে ফেলতে সহায়ক কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’। শতবর্ষ আগে লেখা হলেও বাংলাদেশে এই কাব্যগ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়ে গেছে। কালের সীমা অতিক্রম করা কাব্যগ্রন্থ ‘সাম্যবাদী’ শতবর্ষ পরেও সমাজ বদলের অঙ্গীকাররূপে বিবেচিত।