জুলাই ২০২৪ শহরের বাতাসে তখন অদ্ভুত এক অস্থিরতা। দিনের বেলা মিছিল, সন্ধ্যার পর গুঞ্জন, আর গভীর রাতে ফিসফিস করে ছড়িয়ে পড়া খবর। কে কোন পক্ষে, কে কাকে নজরে রাখছে কেউ নিশ্চিত নয়।
আহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম মেধাবী শিক্ষার্থী। রাজনীতিতে সক্রিয় না হলেও আন্দোলনের ন্যায্য দাবির প্রতি তার সমর্থন ছিল। অর্থের অভাবে সে যে মেসে থাকত, সেখানে স্থানীয় ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মীও থাকত। প্রথমে সে ভেবেছিল, ভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে থেকেও নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করা যাবে। কিন্তু অল্পদিনেই বুঝতে পারল, রাতের পর রাত সেখানে নানা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
সে নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে কখনো প্রকাশ্যে কিছু বলত না। তবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য পেলে গোপনে বন্ধু আলতাফকে জানিয়ে দিত। আলতাফ ছিল আন্দোলনের সমন্বয়কারীদের একজন। কোথায় উত্তেজনা তৈরি হতে পারে, কোথায় সতর্ক থাকা দরকার—এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে তারা অনেককে আগেভাগেই সাবধান করত।
কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একের পর এক পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে লাগল। মেসের বাসিন্দাদের মনে সন্দেহ জন্মাল—তাদের মধ্যেই কেউ খবর বাইরে পাঠাচ্ছে। কথাবার্তা বদলে গেল, চোখের ভাষা বদলে গেল। আহসানও অনুভব করল, কয়েকজন তার দিকে অস্বাভাবিকভাবে তাকাচ্ছে।
এক বিকেলে আলতাফের কাছ থেকে একটি ছোট্ট বার্তা এল—
"আজ মেসে ফিরবে না। জরুরি দেখা করতে হবে।"
আহসানের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছাতেই আলতাফ শান্ত গলায় বলল,
"তোমার ওপর সন্দেহ পড়েছে। আজ রাতে ওখানে গেলে বিপদ হতে পারে।"
আহসান কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল,
"এখন কী হবে?"
আলতাফ মৃদু হাসল।
"তোমাকে একটা কথা আজই জানানো দরকার।"
সে একটু থেমে বলল,
"তিন মাস আগে যে বাবুর্চি তোমাদের মেসে কাজ নিতে এসেছিল, তাকে মনে আছে?"
"অবশ্যই। খুব চুপচাপ মানুষ।"
"তিনি আসলে বাবুর্চি নন। আমাদের একজন স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন। তিনি রান্না করতেন ঠিকই, কিন্তু আমাদের কাছে কোনো সংবেদনশীল তথ্য পাঠাতেন না। তার কাজ ছিল শুধু পরিবেশ বোঝা এবং প্রয়োজনে তোমার নিরাপত্তার খবর দেওয়া। গত দশ দিন আগে আমরা তাকে সরিয়ে নিয়েছি। তিন মাসের বেতন পেয়েছে, এখন নিজের বাড়িতে ফিরে গেছে।"
আহসান বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
আলতাফ আবার বলল,
"আর তোমাদের মেস? স্থানীয় মানুষজন বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলে সেটি আপাতত বন্ধ করে দিয়েছেন। তাই আজ তোমার সেখানে ফেরার দরকার নেই। তোমার বই, কাপড় আর অন্য জিনিসপত্র নিরাপদে আছে। সময়মতো সব তোমার হাতে পৌঁছে যাবে।"
আহসানের বুকের ভেতর জমে থাকা ভয় ধীরে ধীরে হালকা হয়ে এল। এতদিন সে ভেবেছিল, সব দায়িত্ব একাই বহন করছে। আজ বুঝল, অনেক অচেনা মানুষও নীরবে একে অন্যের নিরাপত্তার জন্য কাজ করছিল।
সন্ধ্যা নেমে এলো। দূরে কোথাও মানুষের কণ্ঠে স্লোগান ভেসে আসছিল। আহসান আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবল—ইতিহাসে বড় বড় ঘটনার পেছনে শুধু সামনে থাকা মানুষেরাই নয়, আড়ালে থাকা অসংখ্য নীরব মানুষও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারও হাতে ছিল মাইক, কারও হাতে ব্যানার, আর কারও দায়িত্ব ছিল শুধু সময়মতো একজন বন্ধুকে সতর্ক করে দেওয়া।
কখনও কখনও একটি ছোট্ট বার্তাই একটি জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে।
মানবকণ্ঠ/এমআর




Comments