৮ আগস্ট, ২০২৪, সকাল ৮ টা। ঢাকা তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। রাতের বৃষ্টির পানি হাসপাতালের সামনের পথটাকে চকচকে করে রেখেছে।ইবনে সিনা হাসপাতালের রিসেপশনে তখন মাত্র সকালের শিফট শুরু হয়েছে। রিসেপশনিস্ট কম্পিউটার চালু করছে, নিরাপত্তারক্ষী হাই তুলতে তুলতে গেটের দিকে তাকিয়ে আছে।
ঠিক তখনই কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন এক ব্যক্তি।
গায়ে বিবর্ণ, ময়লা গেঞ্জি। পরনে লুঙ্গি। কাঁধে একটি পুরোনো গামছা। মুখে অগোছালো দাড়ি, চোখদুটো গভীর ক্লান্তিতে ডুবে আছে।
তিনি ধীরে বললেন,
— "আমি ম্যানেজমেন্টের কারো সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।"
রিসেপশনিস্ট একবার তাকিয়ে আবার কম্পিউটারের দিকে চোখ ফেরাল।
— "স্যার, অফিস তো এখনও শুরু হয়নি। দশটার আগে কেউ আসবেন না।"
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর নিচু স্বরে বললেন,
— "আমি কারও নম্বর জানি না। আপনারা কি একজনের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলিয়ে দিতে পারবেন?"
মেয়েটি কিছুটা দ্বিধায় পড়ল। লোকটির চেহারা ভিখারির মতো, কিন্তু কথাবার্তায় অদ্ভুত একটা শিক্ষিত ভদ্রতা।
সে অবশেষে প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নম্বর ডায়াল করে ফোনটি তাঁর হাতে দিল।
লোকটি একটু দূরে সরে গেলেন।
ফ্ল্যাশ ব্যাক
বহু বছর আগের স্মৃতি একের পর এক ফিরে আসতে লাগল।
তিনি ব্যারিস্টার আরমান।
একসময় আদালতে তাঁর যুক্তি শুনতে বিচারক পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে বসে থাকতেন।
তার বাবাকে ফাসিতে ঝুলিয়া হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল এক ফরমায়েশী আদালত, এরপর আপীল বিভাগ হয়ে, রিভিউ সর্বত্রই ফাসির আদেশ বহাল রাখা হয়। ফাসি কার্যকর করার আগের রাতে, পুলিশ পরিচয়ে বাসা থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়,
"কিছু প্রশ্ন আছে। সকালে ফিরিয়ে দেব।"
সেই সকাল আর আসেনি।
তারপর দীর্ঘ অন্ধকার।
জানালাবিহীন একটি কক্ষ।
দিন-রাতের হিসাব হারিয়ে যাওয়া।
পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই।
বিধবা মা প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
স্ত্রী প্রতিরাতে খাবার গরম করেন, আবার ঠান্ডা হয়ে গেলে সরিয়ে রাখেন।
দুই সন্তান বাবার ছবি জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
আরমান জানতেন না বাইরে পৃথিবীতে কী ঘটছে।
একদিন হঠাৎ সব বদলে গেল।
রাতে খাবার দেওয়া হলো না।
সকালেও না।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর তিনি লক্ষ্য করলেন, লোহার গেটে কোনো তালা নেই।
সাবধানে ঠেলে খুললেন।
কেউ বাধা দিল না।
কেউ প্রশ্ন করল না।
যেন তিনি কখনো সেখানে ছিলেনই না।
তিনি বেরিয়ে এলেন।
পায়ে জুতা নেই।
শুধু লুঙ্গি আর কাঁধে একটি গামছা।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়ল একটি পরিচিত নাম—
ইবনে সিনা হাসপাতাল।
হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়ল।
"এই প্রতিষ্ঠান শুধু একটা হাসপাতাল নয়, মানুষের সেবা করার অঙ্গীকার।"
ফোনের ওপাশে কণ্ঠ ভেসে এল।
_বর্তমান_
— "হ্যালো?"
আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— "আমি... আরমান বলছি।"
ওপাশে নীরবতা।
তারপর বিস্মিত কণ্ঠ,
— "আপনি... কোথায় আছেন?"
— "রিসেপশনে।"
— "এক মিনিট... কোথাও যাবেন না।"
মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে হাসপাতালের পরিবেশ বদলে গেল।
একজন কর্মকর্তা দৌড়ে এলেন।
তারপর আরেকজন।
নিরাপত্তারক্ষীরা সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
কেউ বললেন,
— "স্যারকে ভিআইপি গেস্ট রুমে নিয়ে চলুন।"
গরম পানি আনা হলো।
নতুন কাপড় আনা হলো।
চা, নাস্তা, খাবার সাজানো হলো।
সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যেই প্রতিষ্ঠানের প্রায় পুরো ম্যানেজমেন্ট সেখানে উপস্থিত।
কেউ ফোন করছেন।
কেউ কাঁদছেন।
কেউ বারবার বলছেন,
— "ম্যাডামকে খবর দিন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে আসুন।"
সকাল আটটার একটু পরে গেস্ট রুমের দরজা খুলল।
প্রথমে ঢুকলেন তাঁর মা।
এক বৃদ্ধা কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এসে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
— "বাবা... তুই বেঁচে আছিস?"
আরমানের চোখের জল আর থামল না।
এরপর ঢুকলেন তাঁর স্ত্রী।
কত বছরের অপেক্ষা, কত না বলা কথা—সব যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল।
তিনি শুধু স্বামীর হাত দুটো শক্ত করে ধরে বললেন,
— "আমি জানতাম... একদিন তুমি ফিরবে।"
পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল দুই সন্তান।
ছোট ছেলে ইতস্তত করে সামনে এসে জিজ্ঞেস করল,
— "বাবা... এবার আর কোথাও যাবে না তো?"
আরমান ছেলেকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন।
কোনো উত্তর বের হলো না।
শুধু কান্না।
ঘরে উপস্থিত সবাই নিঃশব্দে চোখ মুছছিল।
বাইরে তখন হাসপাতালের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে।
অ্যাম্বুলেন্স আসছে।
রোগীরা প্রবেশ করছে।
জীবন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলেছে।
আর গেস্ট রুমের ভেতরে একটি পরিবার বহু বছরের বিচ্ছেদের পর আবার একসঙ্গে বসে আছে।
সেদিন সকালের সেই পুনর্মিলনের সাক্ষী ছিল শুধু কয়েকজন মানুষ নয়—ছিল নীরব দেয়াল, ভেজা জানালা আর এক নতুন ভোরের আলো।
২০২৬ এর ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে এই আইনজীবী আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে রাজকীয় প্রত্যাবর্তন হয়।




Comments