Image description

২০২৬ সালের জুলাই মাস। রাত সাড়ে আটটা। ঢাকার ডেমরা বাসস্ট্যান্ডে মানুষের ভিড়।
দিপু খান ছোট্ট একটি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সিলেটগামী বাসে উঠল। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের সময় ডেমরা এলাকার অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছিল সে। আন্দোলনের পর থেকে একের পর এক হুমকি, নজরদারি, বিভিন্ন প্রলোভন—সবকিছুই তার জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছিল।
বাসে ওঠার আগে মা ফোন করলেন।
— "বাবা, পৌঁছেই ফোন দিবি।"
— "অবশ্যই আম্মা। দুই-তিন দিনের মধ্যেই চলে আসব।"
— "সাবধানে থাকিস। তোর জন্য আমার সবসময় ভয় লাগে।"
দিপু হেসে বলল,
— "এখন আর ভয়ের কিছু নেই আম্মা। সব ঠিক আছে।"
কিন্তু ফোন কেটে যাওয়ার পরও বুকের ভেতর অজানা একটা অস্বস্তি কাজ করছিল।
রাত প্রায় আড়াইটা।
বাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাছাকাছি পৌঁছাতেই হঠাৎ সামনে একটি কালো মাইক্রোবাস আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে গেল।
ড্রাইভার জোরে ব্রেক করল।
চার-পাঁচজন লোক দ্রুত বাসে উঠে পড়ল।
একজন গম্ভীর গলায় বলল,
— "আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যেতে হবে।"
বাসের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল।
লোকটি মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "দিপু খান কে?"
দিপু ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
— "আমি। কী হয়েছে?"
— "কিছু প্রশ্ন আছে। পাঁচ মিনিট লাগবে।"
পাশের যাত্রী বললেন,
— "আইডি কার্ড দেখান।"
সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন কোমরের অস্ত্র দেখিয়ে বলল,
— "বেশি কথা বলবেন না। সরকারি কাজ।"
দিপুকে জোর করে বাস থেকে নামিয়ে মাইক্রোবাসে তুলে ফেলা হলো।
মুখে কালো কাপড় বেঁধে দেওয়া হলো।
গাড়ি দ্রুত অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
সকাল সাতটা।
দিপুর মায়ের ফোন বেজে উঠল।
— "আপনার ছেলে আমাদের কাছে আছে।"
মা কাঁপা গলায় বললেন,
— "কে? কী বলছেন?"
— "২০ লাখ টাকা লাগবে। টাকা দিলে ছেলে ফিরে যাবে। পুলিশে খবর দিলে ছেলের লাশও পাবেন না।"
মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
— "আমরা সাধারণ মানুষ। এত টাকা কোথায় পাব?"
ফোনের ওপাশ থেকে ঠান্ডা উত্তর এলো,
— "বাড়ি বিক্রি করেন, ধার করেন—আমাদের কিছু যায় আসে না।"
ফোন কেটে গেল।
দিপুকে নিয়ে যাওয়া হলো গ্রামের একটি পুরোনো টিনের বাড়িতে।
চোখের কাপড় খুলতেই সে দেখল চারপাশে কয়েকজন সশস্ত্র লোক।
একজন হেসে বলল,
— "চিনতে পারছিস?"
দিপু তাকিয়ে রইল।
লোকটা এগিয়ে এসে বলল,
— "২০২৪ সালে খুব বড় নেতা হয়েছিলি না?"
আরেকজন বলল,
— "তোর জন্য আমাদের অনেক লোক পালিয়ে বেড়াচ্ছে।"
দিপু শান্ত গলায় বলল,
— "আমি কোনো অপরাধ করিনি।"
লোকটা টেবিলে ঘুষি মারল।
— "চুপ! হানি ট্র্যাপ দিলাম—কাজ হলো না। টাকা অফার করলাম—রাজি হলি না। এখন দেখ, কেমন লাগে!"
আরেকজন হেসে বলল,
— "বিশ লাখ টাকা তো অজুহাত। আসল হিসাব অন্য।"
দিপু বুঝতে পারল, এটি শুধু মুক্তিপণের ঘটনা নয়; প্রতিশোধও এর অংশ।
সন্ধ্যায় অপহরণকারীরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল।
— "পুলিশ নড়েচড়ে বসেছে।"
— "কেউ খবর দিয়েছে নাকি?"
— "অসম্ভব। আমাদের লোক সব জায়গায় আছে।"
হঠাৎ একজন দৌড়ে এসে বলল,
— "ফোন ব্যবহার কমাও। একই নম্বর বারবার ব্যবহার করা যাবে না।"
অন্যদিকে এসপি আসাদ চৌধুরী  জেলার কন্ট্রোল রুমে বসে মানচিত্র দেখছিলেন।
একজন কর্মকর্তা বললেন,
— "স্যার, ওরা বারবার অবস্থান বদলাচ্ছে।"
আসাদ সাহেব শান্তভাবে বললেন,
— "ওরা যত নড়বে, তত ভুল করবে। পুরো চক্রটাকে ধরতে হবে। শুধু একজনকে নয়।"
— "স্যার, আজ রাতেই অভিযান?"
— "আরও একটু অপেক্ষা। মূল হোতারা এখনও আসেনি।"
রাত প্রায় দুইটা।
হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ।
অপহরণকারীদের একজন জানালা দিয়ে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,
— "পুলিশ!"
আরেকজন বলল,
— "অসম্ভব! কেউ জানল কীভাবে?"
চারদিক থেকে মাইকে ঘোষণা শোনা গেল।
— "বাড়িটি ঘেরাও করা হয়েছে। অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করুন।"
একজন অপহরণকারী চিৎকার করল,
— "দিপুকে নিয়ে পালাও!"
অন্যজন বলল,
— "পিছনের দরজা!"
কিন্তু সেখানেও পুলিশ।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই সবাই ধরা পড়ল।
একজন মাটিতে বসে মাথায় হাত দিয়ে বলল,
— "শেষ... সব শেষ।"
পরদিন জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে।
একজন ধৃত অপহরণকারী ক্ষুব্ধ গলায় বলল,
— "আমরা তো ভাবছিলাম দিপুকে তুলে নিয়ে নিরাপদে আছি। পরে বুঝলাম, আমরা নিজেরাই ফাঁদে পা দিয়েছি।"
তদন্ত কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করলেন,
— "কী বলতে চাও?"
লোকটি মাথা নিচু করে বলল,
— "এসপি মুকুল খান আমাদের পুরো নেটওয়ার্ক ধরতে দিপুকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করেছে। আমরা যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, যেসব আস্তানায় গেছি—সব নজরদারিতে ছিল।"
আরেকজন যোগ করল,
— "আমরা ভেবেছিলাম আমরা ওদের বোকা বানাচ্ছি। আসলে ওরাই আমাদের হিসাব কষছিল।"
দিপু বিস্মিত হয়ে এসপি আসাদ চৌধুরীর দিকে তাকাল।
— "স্যার... আমি কিছুই জানতাম না।"
এসপি ধীর কণ্ঠে বললেন,
— "তোমাকে আগে থেকে কিছু বলা হলে তদন্ত ব্যর্থ হতে পারত। আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল তোমাকে নিরাপদে উদ্ধার করা, আর একই সঙ্গে পুরো অপহরণকারীচক্রকে আইনের আওতায় আনা।"
দিপু কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
— "আমি শুধু চাই, আর কোনো পরিবার যেন এমন দুঃস্বপ্নের মধ্যে না পড়ে।"
এসপি সাহেব মাথা নাড়লেন।
— "সেই কারণেই এই অভিযান। একজনকে ধরলে আরেকজন তৈরি হয়। কিন্তু পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে পারলে মানুষ কিছুটা হলেও নিরাপদ হয়।"
বাড়ি ফিরে মা ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
— "তোকে ছাড়া এই কয়েকটা দিন মনে হয়েছে পৃথিবী থেমে গেছে।"
দিপুর চোখ ভিজে উঠল।
— "আম্মা, আমি ফিরে এসেছি। এবার নতুন করে বাঁচব।"
জানালার বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। সেই বৃষ্টির শব্দের মাঝেই দিপু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—ভয় নয়, সত্য এবং ন্যায়বিচারের পথেই সে এগিয়ে যাবে।

মানবকণ্ঠ/এমআর