১৯৭১ সালের মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সর্বত্র গুঞ্জন ছিল—৭ মার্চেই হয়তো স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন শেখ মুজিবুর রহমান। সেই প্রত্যাশা নিয়ে সকাল থেকেই লাখো মানুষ জড়ো হতে থাকেন ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে, যা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত।
ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের ঢল নামে ঐতিহাসিক এই মাঠে। বিকেল সোয়া ৩টার দিকে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি ও কালো কোট (মুজিব কোট) পরে শেখ মুজিব সভাস্থলে পৌঁছালে করতালি ও ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
২৩ বছরের বঞ্চনা, বৈষম্য ও নিপীড়নের ইতিহাস তুলে ধরে শেখ মুজিব দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেন—
“আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না… রক্ত যখন দিয়েছি, আরও রক্ত দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
তার এই ঘোষণায় জনতার আবেগ বিস্ফোরিত হয়। চারদিকে ধ্বনিত হতে থাকে—“জয় বাংলা”, “বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।” এ ঘটনার প্রেক্ষিতে কবি নির্মলেন্দু গুণ পরে লিখেছিলেন—“তারপর থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।”
ভাষণে শেখ মুজিব স্পষ্ট করে জানান, তিনি ক্ষমতা বা প্রধানমন্ত্রিত্ব চান না, চান দেশের মানুষের অধিকার। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি আবার গুলি চালানো হয় বা মানুষ হত্যা করা হয়, তাহলে প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
তার এই নির্দেশ কার্যত সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানকে অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে তার নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়ার আহ্বান হিসেবে দেখা হয়।
৭ মার্চের ভাষণ সরাসরি সম্প্রচারের কথা শুনে সারা বাংলার মানুষ রেডিও নিয়ে অপেক্ষা করলেও শেষ মুহূর্তে সামরিক কর্তৃপক্ষ তা বন্ধ করে দেয়। প্রতিবাদে ঢাকা বেতার-এর বাঙালি কর্মীরা কাজ বন্ধ করে দেন এবং সম্প্রচারও বন্ধ হয়ে যায়।
পরে গভীর রাতে সামরিক কর্তৃপক্ষ ভাষণের পূর্ণ বিবরণ প্রচারের অনুমতি দিলে তা দিয়েই ঢাকা বেতারের সম্প্রচার আবার শুরু হয়।
সেই রাতেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১০ দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অহিংস অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। একই সময় গভর্নর হিসেবে ঢাকায় আসেন টিক্কা খান। বিভিন্ন স্থানে বাঙালি–অবাঙালি সংঘর্ষ এবং সামরিক বাহিনীর গুলিবর্ষণে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ইতিহাসে ৭ মার্চের ভাষণকে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ভাষণই বাঙালি জাতিকে চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করেছিল এবং সূচনা করেছিল স্বাধীনতার নতুন অধ্যায়ের।
তথ্যসূত্র: রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদীর ‘৭১ এর দশমাস’, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সংবাদপত্র
মানবকণ্ঠ/আরআই




Comments