Image description

পার্বত্য চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ‘রাঙ্গামাটি (মানিকছড়ি)-মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্তকরণ ও যথাযথমানে উন্নীতকরণ’ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের মৃত্যুফাঁদ হিসেবে পরিচিত ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো অবশেষে সংস্কার ও প্রশস্ত হতে যাচ্ছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের এক মেগা প্রকল্পের আওতায় এই সড়কের আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা এই জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানের অপ্রশস্ত ১২ ফুটের এক লেনের সড়কটিকে ১৮ ফুটের দুই লেনে উন্নীত করা হবে। এছাড়াও সড়কে রয়েছে ৮৫টি কালভার্ট  নির্মাণ এবং ১৩টি বিদ্যমান কালভার্ট সম্প্রসারণ করা হবে এবং  প্রায় ৮০ হাজার বৃক্ষরোপণ সংস্কার করা হবে। সরকারি অর্থায়নে (জিওবি) বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের মাধ্যমে পাহাড়ের দুই প্রধান জেলার মধ্যে নিরাপদ ও দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

সূত্রে আরো জানা গেছে, প্রায় ১ হাজার ৬৪ কোটি ২৬ লক্ষ ১১ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই প্রকল্পের আওতায় ৬১.৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি প্রশস্ত ও আধুনিকায়ন করা হবে। এই সড়কের কারণে পর্যটন শিল্প ,ক্ষুদ্র শিল্প ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি পাবে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উদ্যেগে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে এটি নিমিত হবে। এ প্রকল্পের উদ্দেশ্যে হচ্ছে রাঙ্গামাটি সড়ক সার্কেলের আওতাধীন রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি সড়ক বিভাহগর অর্ন্তগত অপ্রশস্ত এ আঞ্চলিক মহাসড়কটি প্রশস্তকরনের মাধ্যমে বিরাজমান সড়ক নেটওয়র্কের মান উন্নয়ন তথা উন্নত ,নিরাপদ,আরামদায়কএবং সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ী সড়ক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কটি প্রশস্ত ও মজবুত করা হলে কেবল দুর্ঘটনাই কমবে না, বরং এই অঞ্চলের কৃষিখাতেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত ও কম খরচে বাজারে পৌঁছাতে পারবেন। এছাড়া সাজেকসহ অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রে যাতায়াতকারী পর্যটকদের জন্যও এই মহাসড়কটি নিরাপদ ও আরামদায়ক হবে।
 
এই সড়কে প্রতিনিয়ত যাতায়াতকারী ট্রাক ও অটোরিক্সশা চালক অজয় আসাম ও মোঃ মিজান জানান, “এই সড়কটি বড় হলে আমরা শান্তিভাবে গাড়ি চালাতে পারবো এবং পথে ঘাটে দুর্ঘটনা কমে যাবে পাশাপাশি এলাকার উন্নয়ন হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন মানে তো এলাকার উন্নয়ন এবং সামগ্রিক উন্নয়ন এবং সামাজিক উন্নয়ন সবকিছু এটির সাথে জড়িয়ে আছে”।

রাঙ্গামাটির মানিকছড়ি এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিক আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, সাড়ে ৬১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি বর্তমানে অত্যন্ত সরু এবং অসংখ্য তীক্ষ্ন বাঁক ও পাহাড়ী ঢালে ভরা। দীর্ঘদিন ধরে ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে সিঙ্গেল লেনের এই সড়কে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে আসছিল। বিশেষ করে রাঙ্গামাটি সদর, নানিয়ারচর ও মহালছড়ি উপজেলার বাসিন্দাদের জন্য এই সড়কটি ছিল আতঙ্কের নাম। নতুন প্রকল্পের আওতায় সড়কটি সিঙ্গেল লেন থেকে ডাবল লেনে উন্নীত করা হবে, যা সরাসরি দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমিয়ে আনবে।

নানিয়ারচর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ নুরুজ্জামান জানান, “চার দশক ধরে এই সড়কটি অনেকটা অবহেলিত ছিল। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোর কারণে গাড়ি চালানোর সময় বুক দুরুদুরু করত। এখন সড়ক প্রশস্ত করার খবর আমাদের জন্য বড় স্বস্তির।”

রাঙ্গামাটি সড়ক ও জনপদ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, রাঙ্গামাটি-মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি সড়কটি একটি আঞ্চলিক মহাসড়ক। এই সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬১ দশমিক ৫ কিলোমিটার। আঞ্চলিক মহাসড়ক হলেও এই সড়কের বর্তমান প্রশস্ততা হচ্ছে ১২ ফুট। এই সড়ক সরু বা চিকন হওয়ার কারণে বর্তমান সরকার এই সড়ক প্রশস্তকরণ ও যথাযথ মানে উন্নয়ন করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি আরো জানান, গত ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ সালে একনেক সভায় ১০৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছে। এই প্রকল্পে ৮৫টি কালভার্ট  নির্মাণ এবং ১৩টি বিদ্যমান কালভার্ট সম্প্রসারণ করা হবে এবং প্রায় ৮০ হাজার বৃক্ষরোপনের সংস্কার রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে পার্বত্য এই জনপদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং পর্যটন শিল্পে বিকাশ ঘটবে এবং দুর্ঘটনা হ্রাস পাবে।