Image description

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার স্বীকৃতির দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সভায় একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। গত শুক্রবার (২০ মার্চ) মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছেন পরিষদের সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান।

প্রস্তাবটিতে একাত্তরে বাংলাদেশে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ছাড়াও ধর্ষণ ও বাস্তুচ্যুতির মতো নৃশংসতার কথা উল্লেখ করে অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে উত্থাপিত প্রস্তাবটি বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে।

প্রস্তাবে বলা হয়, ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সমাপ্তি ঘটলে পাকিস্তান ও ভারত নামে দু’টি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরমধ্যে পাকিস্তানের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তান (পাকিস্তান) অন্তর্ভুক্ত ছিল। তৎকালীন সময়ে যেটি পূর্ববঙ্গ নামে পরিচিত ছিল।

এতে আরও বলা হয়, পাঞ্জাবি পশ্চিম পাকিস্তানিরা মূলত পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ছিল। দেশের সম্পদ ও উন্নয়নের সব প্রচেষ্টা তারা পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীভূত করেছিলেন। নথিপত্রে প্রমাণিত যে পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রবল বাঙালি-বিদ্বেষ বিদ্যমান ছিল এবং তারা বাঙালিদের নিচু জাতের মানুষ মনে করতেন।

পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের ইশতেহার নিয়ে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ পরিষদের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এরপর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান, পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে সরকার গঠনের আলোচনা ব্যর্থ হয়।

একপর্যায়ে পাকিস্তান সরকার ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাবন্দি করার পাশাপাশি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘উগ্রপন্থি’ দলগুলোর সহায়তায় পূর্ব পাকিস্তানে অপারেশন সার্চলাইট নামে দমন অভিযান শুরু করে। যার অংশ হিসেবে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। বর্বর এ হত্যাযজ্ঞে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন অনুমান থাকলেও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ পর্যন্ত। এছাড়াও দুই লাখের বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন এবং সামাজিক গ্লানির কারণে তাদের প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত কখনো জানা যাবে না এবং ভুক্তভোগীদের নাম স্মরণ করা হবে না।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে উত্থাপিত প্রস্তাবে আরও বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী যখন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিল, ওই সময় তাদের অনেকের কাছেই হত্যার তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের নাম ছিল। একাত্তরের ১৩ জুন দ্য সানডে টাইমসে সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘জেনোসাইড’ শিরোনামের একটি কলামে এ তথ্য উঠে এসেছে।

পরবর্তীতে ২৮ মার্চ তৎকালীন ঢাকাস্থ মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনে ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’ শিরোনামে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। ওই টেলিগ্রামে তিনি লেখেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সমর্থনে অ-বাঙালি মুসলমানরা পরিকল্পিতভাবে গরিব মানুষের বসতিগুলোতে হামলা চালাচ্ছেন এবং বাঙালি ও হিন্দুদের হত্যা করছেন।’

এরপর ৬ এপ্রিল কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নীরবতার বিরুদ্ধে ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত একটি প্রতিবাদলিপি পাঠান। যেখানে ঢাকা কনস্যুলেট জেনারেলের ২০ জন মার্কিন কূটনীতিকের স্বাক্ষরে বলা হয়, ‘‘দুর্ভাগ্যবশত যেখানে জেনোসাইড বা গণহত্যা শব্দ প্রযোজ্য, সেই ‘আওয়ামী’ সংঘাতকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে গণ্য করে আমরা নৈতিকভাবেও হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সাধারণ মার্কিনরা এ নিয়ে ঘৃণা প্রকাশ করেছেন’’ এবং ব্লাড নিজেও এ আপত্তির সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন।

পরবর্তীতে ৮ এপ্রিল কনসাল জেনারেল ব্লাড আরও একটি টেলিগ্রাম পাঠান। যেখানে উল্লেখ করা হয়, “হিন্দুদের ওপর যে নগ্ন, পরিকল্পিত ও ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে, তার ক্ষেত্রে ‘গণহত্যা’ শব্দটি পুরোপুরি প্রযোজ্য...”।

এদিকে ১৯৭১ সালের ১ নভেম্বর শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুতদের সমস্যা তদন্তে গঠিত সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটির উপকমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর এডওয়ার্ড এম কেনেডি কমিটির কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেন। যেখানে বলা হয়, ‘২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে সুপরিকল্পিত সন্ত্রাস ও গণহত্যা শুরু করেছে, তার চেয়ে স্পষ্ট ও নথিবদ্ধ প্রমাণ আর কিছু হতে পারে না। মার্কিন সরকারের কাছে পাঠানো মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন, সাংবাদিকদের অসংখ্য চাক্ষুষ বিবরণ, বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন এবং উপকমিটির কাছে থাকা অতিরিক্ত তথ্যপ্রমাণ পূর্ববঙ্গে চলমান এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সাক্ষ্য দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। তাদের জমি ও দোকানপাট লুট এবং পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। কোনো জায়গায় তাদের শরীরে হলুদ রঙের “এইচ” চিহ্ন এঁকে দেয়া হয়েছে। এসব ঘটনা ইসলামাবাদের জারি করা সামরিক আইনের অধীন সরকারিভাবে অনুমোদন, আদেশ ও কার্যকর করা হয়েছে।’

অন্যদিকে ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ইভেন্টস ইন ইস্ট পাকিস্তান’ শীর্ষক এক আইনি গবেষণায় ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টের সচিবালয় উল্লেখ করেছে, ‘এমন অকাট্য প্রমাণ রয়েছে, হিন্দুদের হত্যা এবং ঘরবাড়ি ও গ্রাম ধ্বংস করা হয়েছে শুধু হিন্দু হওয়ার কারণে।’

জাতিসংঘের ‘কনভেনশন অন দ্য প্রিভেনশন অ্যান্ড পানিশমেন্ট অব দ্য ক্রাইম অব জেনোসাইড’ (গণহত্যা সনদ) অনুযায়ী, গণহত্যা বলতে বোঝায় ‘কোনো জাতীয়, জাতিগত, নৃগোষ্ঠীগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত যেকোনো কাজ।’ তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার ঘটনাগুলো নথিবদ্ধ করা ও স্মরণ করা অত্যন্ত জরুরি; যাতে ভুক্তভোগীদের স্মৃতি রক্ষা করা যায় এবং ভবিষ্যতে এমন নৃশংসতা রোধ করা সম্ভব হয়। এজন্য প্রতিনিধি পরিষদে নিচের প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করা হোক:

১) একাত্তরের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর চালানো নৃশংসতার নিন্দা জানাচ্ছে;

২) স্বীকৃতি দিচ্ছে যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের ‘ইসলামপন্থি’ সহযোগীরা ধর্ম ও লিঙ্গ-নির্বিশেষে জাতিগত বাঙালিদের নির্বিচার হত্যা; তাদের রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীদের হত্যা এবং হাজার হাজার নারীকে ‘যৌনদাসী’ হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য করেছেন। তারা বিশেষভাবে হিন্দু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, গণধর্ষণ, ধর্মান্তরকরণ ও জোরপূর্বক বিতাড়নের লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন;

৩) স্বীকৃতি দিচ্ছে যে কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায় তাদের কোনো সদস্যের করা অপরাধের জন্য দায়ী নয়;

৪) একাত্তরে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের সহযোগী ‘জামায়াতে ইসলামী’র পক্ষ থেকে জাতিগত বাঙালি হিন্দুদের ওপর চালানো নৃশংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।

মানবকণ্ঠ/ডিআর