Image description

এক সময়ের আধুনিকায়নের স্বপ্ন এখন রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের করুণ সাক্ষী। খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ডেমু (ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট) ট্রেনগুলো এখন মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিশাল এলাকা জুড়ে পড়ে থাকা এসব ট্রেনের ভগ্নদশা দেখে মনে হতে পারে, এটি কোনো সচল রেলের ইয়ার্ড নয়, বরং স্ক্র্যাপ বা ভাঙারির স্তূপ।

২০১৪ সালে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের উন্নত সেবা দিতে চীন থেকে ২০টি ডেমু ট্রেন কেনা হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, চালুর মাত্র এক বছরের মধ্যেই ট্রেনগুলো একে একে বিকল হতে শুরু করে। গত প্রায় পাঁচ-ছয় বছর ধরে সবগুলো ট্রেনই সম্পূর্ণ অচল অবস্থায় পড়ে আছে। বৈদ্যুতিক প্রযুক্তিনির্ভর এসব ট্রেনের ইঞ্জিনসহ মূল্যবান ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশ হয় চুরি হয়ে গেছে, নয়তো মরিচা ধরে ধ্বংস হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট মেকানিক ও প্রকৌশলীদের মতে, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর সঙ্গে এই ট্রেনের প্রযুক্তি মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এছাড়া এসব উন্নত ট্রেন মেরামতের জন্য দেশে কোনো বিশেষায়িত ওয়ার্কশপ বা প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা হয়নি। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ স্থানীয় বাজারে সহজলভ্য না হওয়ায় এবং বিদেশ থেকে আমদানিতে অতিরিক্ত খরচ হওয়ায় মেরামত প্রক্রিয়া থমকে যায়।

অলাভজনক ও অচল হওয়ায় প্রায় দুই বছর আগে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ডেমু ট্রেনগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করে এগুলো ভাঙারি হিসেবে বিক্রির পরিকল্পনা করেছিল। তবে সম্প্রতি সেই অবস্থান থেকে সরে এসে পুনরায় মেরামতের চিন্তা করছে রেলওয়ে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজার হোসেন এ বিষয়ে বলেন, “ট্রেনগুলোর বডি ফাইবার দিয়ে তৈরি হওয়ায় ভাঙারি হিসেবে এগুলো খুব একটা লাভজনক হবে না। শুধুমাত্র কিছু লোহার দাম পাওয়া যাবে। তাই আমরা এগুলো মেরামত করে পুনরায় সচল করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবছি।”

তবে রেলওয়ের এই নতুন উদ্যোগ নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। রেল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান প্রশ্ন তুলেছেন, যে ট্রেন সচল থাকাকালীন জ্বালানি খরচই তুলতে পারেনি, তা নতুন করে কোটি কোটি টাকা খরচ করে মেরামত করা কতটা যৌক্তিক হবে? তিনি সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, “কাউকে বিশেষ সুবিধা দিতে বা নতুন কোনো দুর্নীতির পথ তৈরি করতেই কি এই মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?”

রেলওয়ের তথ্যমতে, শুরু থেকেই এই প্রকল্পটি ছিল একটি চরম ব্যর্থতা। সচল থাকা অবস্থায়ও ডেমু ট্রেনগুলো থেকে সংগৃহীত আয় দিয়ে তাদের নিয়মিত তেলের খরচও মেটানো সম্ভব হয়নি। এখন এই মৃতপ্রায় প্রকল্পকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা নতুন করে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

মানবকণ্ঠ/ডিআর