আমলাতন্ত্রে বুমেরাং জ্বালানি নিরাপত্তা; সংকট আরও তীব্রতর হওয়ার শঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্য থেকে একের পর এক তেলবাহী জাহাজ আসছে। বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি সংগ্রহ করছে সরকার। অবৈধভাবে মজুত করা তেল উদ্ধার, পাম্পগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধি ও ট্যাগ অফিসার নিয়োগের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতকিছুর পরও সংকট কাটানো তো দূরে থাক, উল্টো তেলের খড়া আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, পেট্রল পাম্প মালিক এবং তেল সংগ্রহকারী ভুক্তভোগীরা দীর্ঘমেয়াদি এই দুর্দশার জন্য সরকারের সদিচ্ছার বিষয়ে কোন প্রশ্ন না তুললেও আমলাদের একের পর এক অদূরদর্শী সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন। এই ইস্যুকে জিইয়ে রেখে এক শ্রেণির আমলা পরিকল্পিতভাবে সরকারকে বেকয়াদায় ফেলার চেষ্টা করছেন কি না, এমন প্রশ্নও তুলছেন।
জানা গেছে, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত ৬ মার্চ জ্বালানি তেল রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু ১৫ মার্চ জনভোগান্তির মুখে তা প্রত্যাহার করতে হয়। জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, রেশনিংয়ের সময় ও পদ্ধতি উভয়ই ছিল ত্রুটিপূর্ণ। সাড়ে ১৩ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি ট্যাঙ্কারে মাত্র সাড়ে ৩ থেকে ৫ হাজার লিটার তেল নেয়ার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলে দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা ট্যাঙ্কারগুলোর পরিবহন খরচ ও চালকের মজুরি বহন করার পর এত অল্প তেল নেয়ায় প্রতিটি ট্রিপেই লোকসান গুনতে হয়েছে। এ কারণে অনেক পাম্প মালিক ইচ্ছাকৃতভাবে ডিপো থেকে তেল উত্তোলন করেননি। ঈদের ছুটি এবং যুদ্ধ পরি¯ি’তির আশঙ্কার মধ্যে এমন সিদ্ধান্তকে অদূরদর্শী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ঈদুল ফিতরে টানা সাত দিন ব্যাংক বন্ধ থাকায় পে-অর্ডারের মাধ্যমে পাম্প মালিকদের তেল উত্তোলন সম্ভব হয়নি। ফলে ওই সময়ে পাম্পগুলোতে তীব্র তেল সংকট দেখা দেয়। এতে সাধারণ মানুষ ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল মজুত করতে শুরু করে। ব্যাংক বন্ধ থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি কেন, এ প্রশ্নও উঠেছে। আমলাদের এমন নিষ্ক্রিয়তা তাদের অদূরদর্শিতা, অদক্ষতা নাকি ই”ছাকৃত অবহেলা, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেভাবে বাড়ছে, তাতে সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মক চাপে পড়ছে।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) ইমরান বলছেন, আমলাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পরই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। যখন দরকার ছিল তখন রেশনিং করেনি, যখন করেছে সেটাও সঠিকভাবে করতে পারেনি। ফলে সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতে হয়েছে। এখন আবার বলছে মান যাচাই করবে। এই সংকটকালে এই ধরনের উদ্যোগ পুরো পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করবে বলে মনে করেন তিনি। এক শ্রেণির আমলা পরিকল্পিতভাবে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছেন কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
বাংলাদেশ সাধারণত অপরিশোধিত (ক্রুড অয়েল) ও পরিশোধিত এই দুই ধরনের জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। আমদানি করা অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে শোধন করে ডিজেল, জেট ফুয়েল, ফার্নেস অয়েল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিন উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৬৮ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ৬৩ লাখ টন তেলই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়; বাকি ৫ লাখ টন পেট্রোল ও অকটেন স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। আমদানি করা তেলের মধ্যে ১৫ লাখ টন হলো অপরিশোধিত (ক্রুড অয়েল), যা মূলত হরমুজ প্রণালি হয়ে বাংলাদেশে আসে। বাকি ৪৭ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি অন্যান্য দেশ থেকে আনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ডিজেল, জেট ফুয়েল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল ও মেরিন ফুয়েল।
হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২২ শতাংশই হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। সম্প্রতি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই রুটটি বন্ধ থাকায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে গভীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এখন অবশ্য বাংলাদেশি কিছু জাহাজকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে ইরান।
এছাড়া দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অলিখিত ও অদৃশ্য উৎস থেকেও জ্বালানি তেল আসে, যার পরিমাণও নেহায়েত কম নয়। বিদেশ থেকে আসা জাহাজ (মাদার ভেসেল) থেকে বিভিন্ন উপায়ে সরকারি হিসাবের বাইরে বিপুল পরিমাণ তেল আনা হয় এবং তা অনানুষ্ঠানিকভাবে কেনাবেচা হয়।
কাগজে-কলমে বিষয়টি অবৈধ হলেও এটি এক ধরনের ‘ওপেন সিক্রেট’। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের একটি বড় অংশের গ্রাহকের জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণ হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই সরবরাহ ব্যবস্থায় হঠাৎ কড়াকড়ি আরোপ করার পরামর্শ দি”েছন আমলারা। এটি হলে, মাদার ভেসেলের তেল হয়তো পানিতেই পড়ে থাকবে, কিন্তু দেশের জ্বালানি সংকট আরও তীব্রতর হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে তেলের রেশনিং জটিলতা কাটিয়ে ওঠার আগেই জ্বালানি তেলের মান যাচাইয়ে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)।
পেট্রোল পাম্প মালিকরা বলছেন, পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন না করে আমলাদের একের পর এক হঠকারী সিদ্ধান্ত জনভোগান্তি আরও বাড়িয়ে তুলবে। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় সরকারি কর্মকর্তারা কতটা সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে তেল সংকট নিরসনে সরকারের নেয়া পদক্ষেপ উল্টো ‘বুমেরাং’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিএসটিআইয়ের পরিচালক প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়েছে, দেশের বিভিন্ন ডিপো ও পাম্পে জ্বালানি তেলের মান যাচাইয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। তবে সংশ্লিষ্টরা বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগকে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ বলেন, এমনিতেই পাম্পগুলোতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ অতিষ্ঠ, কর্মচারীরাও হিমশিম খাচ্ছেন। এই অবস্থায় যদি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শুরু হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। অতিরিক্ত ঝামেলা এড়াতে অনেক পাম্প মালিক পাম্প বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, গত ১৭ বছর ধরে যেভাবে আমলাদের চরিত্র নষ্ট করা হয়েছে এবং তারা অনেকেই নানাভাবে অনৈতিক সুবিধা ভোগ করেছেন। তাই এসব আমলা দিয়ে অভিযান পরিচালনা বর্তমানে কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডিপো থেকে পাম্পগুলো যে তেল নিচ্ছে, সেখানে মানের ঘাটতি হচ্ছে নাকি পাম্পে আসার পর তেলের মান হারাচ্ছে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অর্থাৎ গোড়ায় গলদ আছে কি না, তাও যাচাই করা দরকার, বলেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অধিক তদারকির নামে পরিাস্থতি অস্থিতিশীল করতে কোনো কোনো আমলা ভূমিকা রাখছেন কি না, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। তবে পাম্পগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন পাম্প মালিকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বারবার ‘কতদিনের তেল মজুদ আছে’ এই ধরনের তথ্য প্রকাশ জনমনে আতঙ্ক ছড়ায়। মন্ত্রীদের দিয়ে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ানোর পেছনেও আমলাদের পরামর্শ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।




Comments