Image description

২০১৪ সালের সেই অভিশপ্ত ২৭ এপ্রিল। তপ্ত দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের জনাকীর্ণ মহাসড়ক থেকে নিমিষেই হাওয়া হয়ে যায় দুটি গাড়ি ও সাতজন মানুষ। এরপর চার দিন ধরে চলে এক শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতা, যা ভেঙে যায় ৩০ এপ্রিল যখন একে একে শীতলক্ষ্যা নদীর ধলেশ্বরী মোহনায় ভেসে উঠতে থাকে সাতটি পচন ধরা বীভৎস মরদেহ। প্রতিটি লাশের পেটে বালুভর্তি বস্তা এবং চোখে-মুখে ছিল মধ্যযুগীয় নৃশংসতার ছাপ। সেই মুহূর্ত থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্র ও স্থানীয় মাফিয়াতন্ত্রের এক ভয়াবহ মিথোজীবী সম্পর্কের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। 

২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল এই ট্রাজেডির এক যুগ পূর্ণ হলেও জনমনে আজও সেই ভয়ের স্মৃতি অমলিন। এক যুগ পার হলেও স্বজন হারানো পরিবারগুলোর আর্তনাদ থামেনি, বরং বিচারহীনতা আর দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে সেই ক্ষত আরও গভীর হয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডের মূলে ছিল মূলত আধিপত্যের রাজনীতি এবং নারায়ণগঞ্জের অর্থনৈতিক নাড়িভুঁড়ি নিয়ন্ত্রণ। তৎকালীন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কাউন্সিলর নূর হোসেন এবং প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল এই রক্তপাতের প্রধান কারণ। তদন্তে বেরিয়ে আসে, নজরুলকে সরিয়ে দিতে শীতলক্ষ্যায় ওসমানীয় শামীম ওসমানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আশীর্বাদে নূর হোসেন রাষ্ট্রের বিশেষায়িত বাহিনী র‌্যাবের কিছু উচ্চপদস্থ ও বিপথগামী সদস্যকে ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে এই পৈশাচিক মিশনে নিয়োজিত করেন। এটি ছিল বাংলাদেশের অপরাধ ইতিহাসে প্রথম কোনো ঘটনা যেখানে ভাড়াটে খুনি হিসেবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পোশাক, গাড়ি ও সরকারি অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। আদালত থেকে ফেরার পথে তাদের অপহরণের পর র‌্যাবের টর্চার সেলে নিয়ে গিয়ে ইনজেকশন দিয়ে অচেতন করা এবং পরবর্তীতে শ্বাসরোধ করে হত্যার যে বর্ণনা আদালতে উঠে এসেছে, তা যেকোনো সুস্থ মানুষের পিলে চমকে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। লাশগুলো যেন কখনোই ভেসে না ওঠে সেজন্য প্রত্যেকের পেটে ২৮টি করে ছিদ্র করে ইটভর্তি বস্তা বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছিল। এই নিখুঁত ও পৈশাচিক পরিকল্পনাটি ছিল মূলত পেশাদার খুনি ও ক্ষমতার দাপটে অন্ধ হওয়া এক গডফাদারের যৌথ মস্তিষ্কের ফসল। 

নারায়ণগঞ্জের এই নৃশংসতার গভীরে প্রবেশ করলে অনিবার্যভাবে বেরিয়ে আসে তৎকালীন প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের নিয়ন্ত্রিত এক অন্ধকার সাম্রাজ্যের চিত্র। নারায়ণগঞ্জ মানেই ছিল এক সময় ওসমান পরিবারের চার খলিফা- নাসিম ওসমান, শামীম ওসমান, সেলিম ওসমান এবং আজমেরী ওসমানের অলিখিত শাসন। সাত খুনের ঘটনার পর যখন পুরো দেশ স্তব্ধ, তখন একটি অডিও রেকর্ড ফাঁস হয় যেখানে দেখা যায় শামীম ওসমান প্রধান আসামি নূর হোসেনকে নিরাপদে সীমান্ত পার হতে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। 

এই একটি অডিও ক্লিপই প্রমাণ করে দেয় যে, খুনিদের মাথার ওপর কার অভয়ছত্র ছিল। শামীম ওসমান কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জের ‘সুপ্রিম পাওয়ার’, যার ইশারা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ত না। অন্যদিকে তার ভাতিজা আজমেরী ওসমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল শহরের ভেতরে একাধিক ‘টর্চার সেল’ পরিচালনার। শহরের অলিতে-গলিতে গড়ে ওঠা এই সেলগুলোতে মানুষকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন ও হত্যার মাধ্যমে তিনি নারায়ণগঞ্জকে একটি গুমের রাজ্যে পরিণত করেছিলেন। এই পরিবারটি নারায়ণগঞ্জকে এমন এক ‘ভয়ের জনপদে’ রূপ দিয়েছিল যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে ওসমানদের সন্তুষ্টি ছিল অনেক বেশি মূল্যবান।

ওসমান পরিবারের এই ত্রাসের রাজত্ব কেবল সাত খুনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে অপহরণ ও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত ও র‌্যাবের খসড়া চার্জশিটে বেরিয়ে আসে, আজমেরী ওসমানের ‘উইনার ফ্যাশন’ নামক টর্চার সেলে ত্বকীকে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল। আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে তার ক্যাডার বাহিনী যেভাবে কিশোর ত্বকীর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছিল, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। 

অভিযোগ রয়েছে, ত্বকীর মরদেহ শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেয়ার নির্দেশ ছিল খোদ ওসমান পরিবারের উচ্চপর্যায়ের কোনো এক সদস্যের। শুধু ত্বকীই নয়, আশিক, মিঠুসহ অসংখ্য মানুষকে এই পরিবারটির রোষানলে পড়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে। নাসিম ওসমান থেকে শুরু করে সেলিম ওসমান পর্যন্ত প্রত্যেকেই ক্ষমতার দাপটে নারায়ণগঞ্জের পরিবহন সেক্টর, ফুটপাত, ঝুট ব্যবসা এবং ‘হোয়াইট হাউস’ খ্যাত টর্চার সেলগুলোর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি ও লুটপাটের এক অভেদ্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। তাদের এই সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে ব্যবহৃত হতো এক বিশাল ক্যাডার বাহিনী, যারা দিনের আলোয় রাজনীতি করত আর রাতের আঁধারে মানুষের রক্ত ঝরাতো।

নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতির প্রধান উৎসগুলো ছিল এই পরিবারের কব্জায়। শীতলক্ষ্যা নদীর বালুমহাল থেকে শুরু করে সিমেন্ট কারখানার সরবরাহ চেইন- সবখানেই ছিল ওসমানদের থাবা। কেউ এই একক আধিপত্যে বাধা দিতে গেলেই তাকে হয় গুম হতে হতো, নয়তো পঙ্গুত্ব বরণ করতে হতো। সাত খুনের মামলার বাদিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনের ওপর বারবার হামলা ও হুমকির ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, এই মাফিয়া চক্র কতটা বেপরোয়া ছিল। তারা বিচারব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দীর্ঘ এক যুগ ধরে আপিল বিভাগে মামলাটিকে ঝুলিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। 

সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় চলা রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে নিজের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ও ঘাতক বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করার যে সংস্কৃতি শামীম ওসমানরা চালু করেছিলেন, তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মূলে কুঠারাঘাত করেছিল। আজ ১২ বছর পর এসেও যখন আজমেরী ওসমানের মতো সন্ত্রাসীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, তখন আইনের শাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দেয়।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য: অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান (বাদীপক্ষের আইনজীবী) অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, আমরা চাই এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির মাধ্যমে কার্যকর করা হোক। এই রায় যদি দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে যারা ওসমানদের মতো খুন-গুমের রাজনীতি করে তাদের জন্য এটি আজীবন শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আজও মানবেতর জীবনযাপন করছে, তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ রাষ্ট্র তার বাহিনীকে খুনিদের হাতে তুলে দিয়েছিল।

অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল আমিন (সংসদ সদস্য, নারায়ণগঞ্জ-৪) বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, সাত খুন ও ত্বকী হত্যার মতো ঘটনায় আগে প্রশাসন ও সরকারের পক্ষ থেকে ওসমানদের মতো গডফাদারদের প্রতি এক ধরনের প্রটেকশন ছিল। বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবেশে সেই সুযোগ আর নেই। অপরাধী যেই হোক, তার পারিবারিক পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতেই হবে। নারায়ণগঞ্জের মানুষ আজ মুক্তি চায়, তারা দেখতে চায় দেশে প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ড. শাহরিয়ার আহমেদ (মানবাধিকার গবেষক) মনে করেন, নারায়ণগঞ্জের সেই দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট পুরোপুরি ভেঙে ফেলা সম্ভব হয়েছে কি না, তা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের বিতর্ক থাকতে পারে। তবে সাত খুন ও ত্বকী হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার মাধ্যমেই এই রাজনৈতিক মাফিয়াতন্ত্রের মূলোৎপাটন সম্ভব। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহারের যে ভয়ংকর সংস্কৃতি শামীম ওসমানরা শুরু করেছিলেন, এই বিচারের মাধ্যমে তার টুটি চেপে ধরা সম্ভব। এটি কেবল একটি বিচার নয়, এটি রাষ্ট্রের শুদ্ধি অভিযানের অংশ হওয়া উচিত। আজকের এই বিশেষ দিনে নারায়ণগঞ্জের আকাশ-বাতাস আবারও ভারি হয়ে উঠছে সেই সাতটি প্রাণের স্বজনদের কান্নায়। কিশোর ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বির অদম্য লড়াই আজও নারায়ণগঞ্জের বিবেককে জাগ্রত করে রাখে। নূর হোসেন, তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, আরিফ হোসেন এবং এম এম রানার মতো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা বর্তমানে কারাগারে থাকলেও তাদের চূড়ান্ত দণ্ড কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত জনমনে স্বস্তি ফিরছে না।