Image description

দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ হয়রানিমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও প্রযুক্তি-নির্ভর হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 

মঙ্গলবার (১৯ মে) ঢাকার তেজগাঁওস্থ ভূমি ভবনে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী দেশব্যাপী ‘ভূমি সেবা মেলা ২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে তিনি এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

উদ্বোধনী বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী যুগ যুগ ধরে চলে আসা ভূমি মালিকানার জটিলতা এবং এর আধুনিকায়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সময়ের পরিক্রমায় একই পরিবারের জমি বিভিন্ন শরিকদের মধ্যে বারবার বণ্টন এবং বিক্রির কারণে মালিকানা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। ১০০ বছর আগে যে জমির মালিক একজন ছিলেন, আজ সেখানে বহু মানুষের অংশীদারিত্ব তৈরি হয়েছে। ফলে জমির রেকর্ড ও হিসাব-নিকাশ নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে ভূমি কর্মকর্তাদের দায়-দায়িত্ব পূর্বের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। মালিকানা, খাজনা, দলিল, খতিয়ান, দাগ, পর্চা ও নামজারির মতো শব্দগুলোর সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষ জড়িত থাকায়, তাদের অধিকার সুরক্ষায় একটি আধুনিক ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই।

প্রধানমন্ত্রী দেশের বর্তমান বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে মামলার চাপ কমাতে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ দেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন আদালতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মিলিয়ে প্রায় ৪৭ লাখেরও বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যার একটি বড় অংশই জমিজমা সংক্রান্ত। এই বিপুল পরিমাণ মামলার জট কমাতে প্রচলিত আদালতের বাইরে গ্রাম আদালত এবং অল্টারনেটিভ ডিস্পিউট রেজুলেশন (এডিআর) তথা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। 

এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি উক্তি স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমঝোতা ও পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা গেলে তা সামাজিক শান্তি বজায় রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদি শত্রুতা দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ভূমি ব্যবস্থাকে সহজ ও আধুনিকায়ন করার বিষয়টি জাতীয় নির্বাচনের আগে ঘোষিত ৩১ দফা এবং সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। তিন দিনব্যাপী এই ভূমি সেবা মেলার আয়োজনের মাধ্যমে সরকার জনগণের কাছে দেওয়া আরেকটি বড় ওয়াদা পূরণ করল।

তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের যাতাকলে পিষ্ট দেশের জনগণ বর্তমানে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তাদের অধিকারের প্রতিফলন দেখতে চায়। এই লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম সপ্তাহ থেকেই নির্বাচনী ইশতেহার এবং ‘জুলাই সনদ’-এর প্রতিটি দফা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়েছে।

জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে সরকারের প্রযুক্তিগত উদ্যোগের বিবরণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, ঘরে বসেই অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান ও অন্যান্য সেবা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি যারা প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে আছেন, তাদের সহায়তার জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পরিচালনায় দেশের ৬১টি জেলায় ইতোমধ্যে ৮৯৩টি ভূমি সেবা সহায়তা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এই সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। 

একই সঙ্গে নাগরিকদের হাতের মুঠোয় দ্রুততম সময়ে সেবা পৌঁছে দিতে ‘ভূমি’ নামে একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ চালু করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। ভূমি ব্যবস্থাপনা যত বেশি আধুনিক হবে, মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের দৌরাত্ম্য তত বেশি কমবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সবশেষে দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিপরীতে মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী কৃষি জমির অপব্যবহার রোধে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার ও নির্ভুল রেকর্ড সংরক্ষণই এখন সময়ের বড় দাবি। আজ থেকে শুরু হওয়া এই মেলায় দেশের নাগরিকরা ই-নামজারি, অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, রেকর্ড সংশোধন, খতিয়ান গ্রহণ এবং ভূমি সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ সরাসরি নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন। একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনে এই মেলা মাইলফলক হয়ে থাকবে আশাবাদ ব্যক্ত করে এবং মেলার সার্বিক সাফল্য কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিববৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।