Image description

বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন কেবল একটি সামাজিক ব্যাধি নয়, বরং এটি বর্তমানে ‘জাতীয় সংকটে’ পরিণত হয়েছে। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, শিশুদের বিরুদ্ধে হওয়া যৌন সহিংসতার মামলায় দণ্ডাদেশের হার মাত্র ২ শতাংশ; অর্থাৎ ৯৮ শতাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা কোনো শাস্তি পাচ্ছে না। শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর শাহবাগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞ ও শিশু সুরক্ষা কর্মীরা এসব তথ্য জানান।

নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেলের উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈঠকে বক্তারা বলেন, দেশের প্রায় ৪৫ মিলিয়নের বেশি শিশু কোনো না কোনোভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জনই মানসিক বা শারীরিক নিষ্ঠুর শাসনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গোলটেবিলে উপস্থাপিত তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশে শিশু ধর্ষণের রিপোর্টকৃত ঘটনা ছিল ৪৫৬টি, যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি। একই সময়ে ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনাও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়, গত এক দশকে শিশুদের বিরুদ্ধে হওয়া ৫৬৬টির বেশি যৌন সহিংসতা মামলার মধ্যে সাজা হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ আসামির। এছাড়া ২০২৬ সালের ১৫ মে পর্যন্ত মাত্র সাড়ে চার মাসে ১৩২ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ২০৭ জন নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।

বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার বলেন, ‘শিশু সুরক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। আমরা শিশু সুরক্ষায় একটি জাতীয় টাস্কফোর্স এবং “ন্যাশনাল কমিশন ফর চাইল্ড প্রোটেকশন” গঠনের প্রস্তাব করছি।’ অপরাধীদের রুখতে তিনি একটি কেন্দ্রীয় ‘চাইল্ড অফেন্ডার রেজিস্ট্রি’ তৈরির আহ্বান জানান।

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন বলেন, ‘প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদক এবং জুয়া শিশুদের নতুন করে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। শুধু আইন করলেই হবে না, এর কঠোর বাস্তবায়ন ও পারিবারিক সচেতনতা জরুরি।’

আলোচিত শিশু নির্যাতনের শিকার রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে প্রশ্ন তোলেন, ‘শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার দায় কার? আমি শুধু ন্যায়বিচার নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা চাই।’

গোলটেবিল বৈঠক থেকে পরিস্থিতির উত্তরণে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়:

১. প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা।
২. জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘চাইল্ড প্রোটেকশন ডেস্ক’ স্থাপন।
৩. দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা।
৪. জাতীয় শিশু হেল্পলাইন ‘১০৯৮’-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি।
৫. শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত জাতীয় ডাটাবেস তৈরি।
৬. শিশু-সংবেদনশীল গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন।
৭. চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ।
৮. নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণা।
৯. অনলাইন অপরাধ থেকে শিশুদের সুরক্ষা।
১০. অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করা।

বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে বিএনপি নেত্রী নিপুণ রায় চৌধুরী, করপোরেট ব্যক্তিত্ব রুবাবা দৌলা, ওজিএসবি সভাপতি অধ্যাপক ফিরোজা বেগম এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

মানবকন্ঠ/আরআই

মানবকন্ঠ/আরআই