চট্টগ্রামের কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতুতে টোল কম্পিউটারাইজড টোকেনে টোল আদায়ের কথা থাকলেও এখানে টোকেন না দিয়েই টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। টোল প্লাজায় সফটওয়্যার কার্যকর থাকার পরও যাতায়াতকারী যানবাহন থেকে আদায়কৃত টোলের জন্য আগের প্রিন্ট করা রশিদ সরবরাহ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে টোকেন দেয়াই হচ্ছে না। সফটওয়্যারের জটিলতা দেখা দিয়েছে এমন অজুহাত দেখিয়ে চালকদের বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে। এতে সরকারি রাজস্ব আদায় তিন মাসের ব্যবধানে কোটি টাকা কমে গেছে।
জানা গেছে, সরকার পরিবর্তনের পর চট্টগ্রামের কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতুতে টোল আদায়ে কারচুপির বিষয়টি সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে। একাধিক যানবাহনের মালিক, চালক ও যাত্রীরা জানিয়েছেন, তাদের গাড়ি থেকে টোল আদায় করা হলেও কোনো টোকেন দেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ অনিয়ম শুরু করেছে টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠান ‘সেল ভ্যান জেভি’।
সূত্রমতে, ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল থেকে দুই বছরের জন্য চট্টগ্রামের কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতুর টোল আদায়ের দায়িত্ব পায় ভারতীয় জয়েন্ট ভ্যানচার প্রতিষ্ঠান ‘সেল ভ্যান জেভি’। তারা জয়েন্ট ভ্যানচারে দেশের আরও কয়েকটি সেতুর টোল আদায় করছে বলে জানা গেছে। চুক্তি অনুযায়ী তারা টোল আদায়ের জন্য সরকারের কাছ থেকে অর্থ পায়, যা দিয়ে তাদের জনবলের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়। তবে এখানে রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি।
টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠান তাদের জনবলের বেতন এবং অন্যান্য খরচের যে বিল দিয়েছে, সেতু কর্তৃপক্ষকে সেই বিল পরিশোধ করতে হয়েছে। অর্থাত্ তারা ইচ্ছেমতো বিল তোলার সুযোগ পেয়েছে। এতে বিল আদায়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিল তোলার সময় অনিয়ম করার সুযোগ পাচ্ছে। গাড়ির টোল আদায়ের সময় রসিদ না দেওয়ায় উত্তোলনকারীরা সেই টাকা নিজের পকেটে ভরছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এক সময় কমিশনের ভিত্তিতে এই সেতুতে টোল আদায় হতো। অর্থাৎ প্রতিমাসে যে পরিমাণ টোল আদায় হতো, তার থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন আদায়ের কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান পেত। গত ২০২৪ সালে এই নিয়ম পরিবর্তন করে বার্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে টোল আদায়ে ভারতীয় এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
শাহ আমানত সেতুর টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠান ‘সেল ভ্যান জেভি’ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল থেকে টোল আদায়ের দায়িত্ব পায় প্রতিষ্ঠানটি। অবশ্য চলতি বছরের ৪ এপ্রিল রাত থেকে এটি সড়ক বিভাগের দায়িত্বে রয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ৭ লাখ ৭০ হাজার ৩৪২টি যানবাহন চলাচলের বিপরীতে ৫ কোটি ৮৭ লাখ ১৩ হাজার ৫৪১ টাকা টোল আদায় করা হয়েছে। মে মাসে ৭ লাখ ৬০ হাজার ৩৭০টি যানবাহন চলাচল করেছে। টোল আদায় হয়েছে ৬ কোটি ৪৩ লাখ ২১ হাজার ২৭৬ টাকা। জুন মাসে ৭ লাখ ৮৪ হাজার ৮৭৪টি যানবাহন থেকে টোল এসেছে ৬ কোটি ৫৮ লাখ ৫৭ হাজার ৪০৮ টাকা। আর জুলাই মাসে ৬ লাখ ৪৭ হাজার ৩৯০টি যানবাহন থেকে রাজস্ব এসেছে ৫ কোটি ৭৮ লাখ ২০ হাজার ৪৯৮ টাকা। আগস্ট মাসে শাহ আমানত সেতু থেকে টোল আদায় হয়েছে ৫ কোটি ৪০ লাখ ৫৮ হাজার ২৯৬ টাকা। কিন্তু কী পরিমাণ গাড়ি চলাচল করেছে, সেই তথ্য দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। জুলাই মাস থেকে আগস্ট মাসে ২৭ লাখ ৬২ হাজার ২০২ টাকা কম আদায় হয়েছে। আবার জুন মাস থেকে আগস্টে এক কোটি ১৭ লাখ ৯৯ হাজার ১১২ টাকা কম আদায় হয়েছে।
চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুসলেহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, টোল প্লাজায় এখনও আমরা কোন ভেন্ডর নিয়োগ দিতে পারিনি। আদায়কৃত অর্থ কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি না দেখে কিছু বলতে পারবো না, দেখে জানাতে হবে। প্রতি মাসের হিসাব প্রতি মাসে করলে হবে না। এটার জন্য পুরো বছর নিয়ে দেখতে হবে। আমাদের প্রতি বছর অডিট হয়। আমরা লাইভ কালেকশান করে থাকি। ইউনিফাইড সফটওয়ার নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক সময় মিস হয়ে যায়। ইউনিফাইডে অনেক বড় সুবিধা রয়েছে সবকিছু রেকডেট থাকে। আমরা এটা মাস শেষে আবার সব দেখি। যদি কোন কিছু ঠিক না করে থাকে তাহলে আমরা জরিমানা করি।
বর্তমানে সড়ক বিভাগের দায়িত্বে টোল আদায়ের কাজ চলছে জানিয়ে এই নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমরা জানতে পারছি, কি পরিমাণ গাড়ি যাতায়াত করছে। সব গাড়ি থেকে টাকা আদায় হচ্ছে কি না, সেটিও দেখার সুযোগ রয়েছে। দৈনিক যে পরিমাণ টোল আদায় করবে, পরদিন সেই পরিমাণ টাকা ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা হয়। সেই কাজ টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠান করে। আমরা এখান থেকে তা তদারকি করি।
এখন কাদের লোক দিয়ে কাজ পরিচালনা করছেন জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুসলেহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এতো লোক আমরা কোথায় পাব। যারা কাজ করে এমন কোম্পানির কাছে থেকে আমরা লোকবল নিয়ে কাজ করছি। নতুন করে টোল আবারও কবে ইজারা দেয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাজ চলমান। টোলের সফটওয়্যার রিলেটেড কাজ বাইরের কোন কোম্পানির মাধ্যমে করা হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, লোক ঢাকা থেকে আসে আর (এমআইএস) আল আমিন এটা দেখে। তিনি বলেন, আপনি নিজে আসেন অথবা কাওকে পাঠান ‘আপনি টু মাচ করছেন’ আমি আর কথা বলতে চাচ্ছি না। এটা বলে ফোন রেখে দেন।
এ বিষয়ে সওজ’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট আহসান হাবিব (অ. দা.) বলেন, আমরা তদন্ত করছি। আসলে কিছু ঘটলে আমরা ধরতে পারবোও না। আইটি অডিট করতে চাচ্ছি। একটা লোককে তো আর চব্বিশ ঘন্টা নজরদারি করা যায় না। আমরা বিসিআইসি দিয়ে একটা অডিটেরর ব্যবস্থা করেছি। বিসিআইসিকে চিঠি দিয়েছি অডিটের জন্য। তারা আমাদেরকে একটা বাজেট দিবে, এরপর আমরা অডিটে যাব। কোন তদন্ত কমিটি দেওয়ার প্রয়োজন হলে সেটাও করব এবং যারা এর সাথে জড়িত আছে তাদেরকে চার্জ করব। আসলে আমাদের এখানে ওরা তিনজন ছাড়া কেউ আইটি বুঝে না। সেজন্য সওজ থেকে কিছু হলেও আমরা সেটা ধরতে পারি না।




Comments