Image description

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশ যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত এগোচ্ছে, তখন সেই ‘সবুজ শক্তি’র আড়ালেই নীরবে জন্ম নিচ্ছে নতুন এক পরিবেশগত বিপর্যয়। ছাদে ছাদে সোলার প্যানেল, গ্রামে গ্রামে সোলার হোম সিস্টেম, বাড়ছে ব্যাটারিচালিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা। 

কিন্তু পরিবেশ রক্ষার এই উদ্যোগই ভবিষ্যতে নতুন এক পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, মেয়াদ শেষে বিপুল পরিমাণ সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার ও চার্জ কন্ট্রোলার পরিণত হবে ভয়ংকর ই-বর্জ্যে। এসব বর্জ্য নিরাপদে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার বা নিষ্পত্তির জন্য দেশে নেই কার্যকর কোনো জাতীয় নীতি, অবকাঠামো কিংবা বাস্তবায়ন পরিকল্পনা। ফলে সবুজ শক্তির আড়ালেই তৈরি হচ্ছে বিষাক্ত এক সংকট, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন—দেশের আগামী দিনের ‘পরিবেশগত টাইম বোমা’।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্রিস্টিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (সিসিডিবি)-এর ক্লাইমেট সেন্টারের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্যানেল থেকেই অদূর ভবিষ্যতে ৩৩ হাজার ২০৫ টন ই-বর্জ্য তৈরি হতে পারে। অথচ এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের কোনো সমন্বিত নীতিমালা বা কর্মপরিকল্পনা নেই। গবেষণা বলছে, সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এই বর্জ্য থেকেই ২৪ হাজার ৪৬৮ টন কাচ, ২ হাজার ৬৫৬ টন অ্যালুমিনিয়াম, ১ হাজার ৪০৪ টন সিলিকন এবং প্রায় ৫০ টন তামা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। কিন্তু পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা না থাকায় মূল্যবান সম্পদের পাশাপাশি হারিয়ে যাচ্ছে পরিবেশ সুরক্ষারও বড় সুযোগ।

উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা। তাদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৬০ সালের মধ্যে শুধু সোলার প্যানেল থেকেই প্রায় ৫৫ লাখ (৫.৫ মিলিয়ন) টন ই-বর্জ্য তৈরি হবে। অর্থাৎ আগামী তিন দশকে দেশের সামনে তৈরি হতে যাচ্ছে নতুন ধরনের এক বর্জ্য সংকট, যার জন্য এখনো কোনো প্রস্তুতি নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সোলার প্যানেলের গড় আয়ুষ্কাল ১৫ থেকে ২৫ বছর। গত দুই দশকে দেশে প্রায় ৬০ লাখ সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন হয়েছে। এর বড় অংশ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে একে একে বাতিল হবে। এসব প্যানেল ও ব্যাটারিতে থাকা সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদসহ ভারী ধাতু মাটি ও পানিতে মিশে কৃষি, জীববৈচিত্র‍্য এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ২৭ থেকে ২৮ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়। এর প্রায় ৯৭ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কোনো নিরাপত্তা ছাড়াই প্রক্রিয়াজাত হয়। পুরান ঢাকা ও বিভিন্ন স্ক্র‍্যাপ মার্কেটে খোলা জায়গায় পুড়িয়ে, এসিড ব্যবহার করে কিংবা হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে মূল্যবান ধাতু আলাদা করা হয়। এতে শ্রমিকরা সরাসরি বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই খাতে প্রায় ৫০ হাজার শিশু কাজ করছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে দেশে কার্যত অরাজকতা চলছে। আইন আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও পুরোনো ইলেকট্রনিক পণ্য ও ই-বর্জ্য আমদানি বন্ধ হয়নি। বিদ্যমান বিধিমালার সংশোধনের পাশাপাশি বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা জরুরি।’

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ‘রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকেল’—এই থ্রি-আর নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে আমরা নতুন পরিবেশ সংকট সৃষ্টি করব।’

ইডকলের গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে মান নিয়ন্ত্রণহীন নিম্নমানের সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশের বিস্তারের কারণে অনেক সিস্টেম নির্ধারিত সময়ের আগেই নষ্ট হচ্ছে। এতে ই-বর্জ্যের পরিমাণ আরও দ্রুত বাড়ছে। ইডকলের ডেপুটি সিইও এস এম মনিরুল ইসলাম বলেন, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উত্পাদন থেকে পুনর্ব্যবহার পর্যন্ত সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সার্কুলার ইকোনমি-ভিত্তিক নীতি গ্রহণ না করলে এবং উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহূত প্যানেল ও ব্যাটারি ফেরত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ না করলে আগামী এক দশকের মধ্যে সোলার ই-বর্জ্য বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত সংকটগুলোর একটিতে পরিণত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে যাত্রা শুরু করা সবুজ শক্তি তখনই সত্যিকার অর্থে টেকসই হবে, যখন এর শেষ পরিণতিও হবে পরিবেশবান্ধব।