Image description

১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা ৪ মার্চ ছিল স্বাধীনতার সংগ্রামে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তাল দিন। পাকিস্তানি শাসকদের অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এদিন সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পর পূর্ব বাংলায় বিক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ঢাকাসহ সারা বাংলায় সর্বাত্মক হরতালসহ অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ফলে প্রদেশের বেসামরিক শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। 

৪ মার্চ লাগাতার হরতালের ছিল তৃতীয় দিন। এদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ছাত্র-জনতা ব্যাপক মিছিল ও সমাবেশ করে। হরতাল চলাকালে খুলনায় সেনাবাহিনীর গুলিতে ৬ জন শহীদ হন। চট্টগ্রামে দুদিনে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় ১২১ জনে।

পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন এ দিন তাদের এক জরুরি সভায় বাংলার জনগণের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে সামরিক শাসন প্রত্যাহারের দাবি জানায়। ওই সভায় ৬ মার্চ সাংবাদিকদের মিছিল এবং বায়তুল মোকাররমে সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

সরকারি অফিস-আদালত কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে বন্ধ থাকে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে জনগণের অসহযোগিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজপথে “জয় বাংলা” স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শ্রমিক-কৃষক সবাই স্বাধীনতার দাবিতে একত্রিত হয়।

বেতার-টেলিভিশন-চলচ্চিত্রা শিল্পীরা এক বিবৃবিতে ঘোষণা করেন, যতদিন পর্যন্ত দেশের জনগণ ও ছাত্রসমাজ সংগ্রামে লিপ্ত থাকবেন, ততদিন পর্যন্ত ‘বেতার ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তারা অংশ নেবেন না।

সেই বিবৃবিতে সই করেন, লায়লা আর্জুমান্দ বেগম, আফসারী খানম, আতীকুল ইসলাম, ফেরদৌসী রহমান, মুস্তফা জামান আব্বাসী, গোলাম মোস্তফা, হাসান ইমাম, জাহেদুর রহিম, আলতাফ মাহমুদ, ওয়াহিদুল হক, এএম হামিদসহ আরও কয়েকজন।

এদিন করাচি প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান দেশকে বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের কাছে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান।

পিডিপি প্রধান নূরুল আমীন এক বিবৃতিতে ১০ মার্চ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে অবিলম্বে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ঢাকায় আহবান করার দাবি জানান প্রেসিডেন্টের কাছে।

পূর্ব পাকিস্তান মহিলা পরিষদের নেত্রী কবি সুফিয়া কামাল ও মালেকা বেগম যৌথ বিবৃতিতে ৬ মার্চ বায়তুল মোকাররম এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনেরও আহ্বান জানান।

এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৫ জন শিক্ষক পৃথক বিবৃতিতে ঢাকার ‘পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকার গণবিরোধী ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৪ মার্চের এই তীব্র আন্দোলনই ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে। দিনটি প্রমাণ করে যে বাঙালি জাতি তখন স্বাধীনতার লক্ষ্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং আর কোনো আপসের পথে ফিরতে রাজি নয়।

অগ্নিঝরা মার্চের প্রতিটি দিনের মতো ৪ মার্চও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।