Image description

বিশ্বাসের ভিত যখন নড়বড়ে হয়ে যায়, তখন সভ্যতার প্রাসাদ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে সময় লাগে না। আমরা আজ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনটি যেমন আমাদের বিশ্ব নাগরিক বানাচ্ছে, তেমনি অজান্তেই আমাদের ঠেলে দিচ্ছে এক অতল গহ্বরে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের জীবনকে গতিশীল করেছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের নৈতিকতা আর মানবিক মূল্যবোধকে করেছে স্থবির। গ্রামীণ প্রবাদে বলা হয়, ‘নদীর জল ঘোলাও ভালো, জাতের মেয়ে কালোও ভালো’, অর্থাৎ আমাদের শেকড়ের যে টান এবং মৌলিক শুদ্ধতা ছিল, ডিজিটাল দুনিয়ার কৃত্রিমতায় আমরা তা হারিয়ে ফেলেছি।

আজ একজন মানুষ অন্যকে চেনে তার প্রোফাইল পিকচার দেখে, তার স্ট্যাটাস পড়ে। কিন্তু সেই আবরণের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল চেহারাটি চেনার ক্ষমতা আমাদের আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ হারিয়ে ফেলেছে। বিশ্বাসের এই সংকটই ডিজিটাল অপরাধীদের প্রধান হাতিয়ার। একটি প্রচলিত লোককথা আছে যে, এক শিকারি বনের পশুপাখি ধরার জন্য খুব সূক্ষ্ম এক জাল পেতেছিল এবং তার ওপর ছড়িয়ে দিয়েছিল সুস্বাদু শস্যদানা। পাখিরা খাবারের লোভে জালের কথা ভুলে সেখানে নামে এবং শেষ পর্যন্ত আটকা পড়ে। 

আমাদের ডিজিটাল জগৎটাও এখন সেই জালের মতো। যেখানে লোভ আর আবেগের শস্যদানা ছিটিয়ে রাখা হয়, আর আমরা সাধারণ মানুষরা সেই মোহে পড়ে নিজেদের জীবন বিপন্ন করি। বিশেষ করে নারী-পুরুষের নিরাপত্তা আজ চরম ঝুঁকির মুখে। একজনের ছবি বা পরিচয় চুরি করে অন্যকে ব্ল্যাকমেইল করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা আমাদের সমাজ কাঠামোর চরম অবক্ষয়কেই নির্দেশ করে। ‘অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ’, এই বাক্যটি বর্তমান ডিজিটাল প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি সত্য। অনলাইনে যখন কেউ হঠাৎ করে খুব বেশি আপন হয়ে উঠতে চায়, তখনই আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু একাকিত্বের এই যুগে আমরা সামান্য সহমর্মিতার লোভে নিজেদের জীবনের সব গোপনীয়তা বিলিয়ে দিই। 

মাকড়সার জালের মতো এই জগৎটি আমাদের এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, আমরা যখন বুঝতে পারি ফাঁদে পড়েছি, তখন আর ফেরার পথ থাকে না। সবচেয়ে বড় পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমান জমানায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভাইরাল হয় বিশ্রী মানসিকতা ও আচরণের লোকগুলোর দ্বারা। তাদের অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি, কুরুচিপূর্ণ কথা কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আমরা ‘বিনোদন’ হিসেবে গ্রহণ করছি, যা প্রকারান্তরে আমাদের আগামী প্রজন্মের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। একবার এক গ্রামের সহজ-সরল মানুষ শহরে গিয়ে এক জাদুকরের পাল্লায় পড়েছিল। জাদুকর তাকে বলেছিল, এই আয়নায় তাকালে তুমি তোমার ভবিষ্যতের ধনসম্পদ দেখতে পাবে। লোকটি লোভে পড়ে আয়নায় তাকালো এবং জাদুকর সেই সুযোগে তার পকেটের সব টাকা হাতিয়ে নিল। আজকের ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলোও অনেকটা সেই জাদুকরের আয়নার মতো। আমাদের তথাকথিত ‘লাইক’ আর ‘শেয়ার’ এর নেশায় বুঁদ করে রেখে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য আর সম্মান লুণ্ঠন করা হচ্ছে। 

ডিজিটাল নিরাপত্তা মানে কেবল পাসওয়ার্ড বা টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন নয়; আসল নিরাপত্তা হলো আমাদের সচেতনতা এবং পরিমিতবোধ। ‘চোর গেলে বুদ্ধি বাড়ে’, এই মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এই ডিজিটাল অবক্ষয়ের পাশাপাশি সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে মাদকের বিষাক্ত দংশন। যুবসমাজ একটি জাতির মেরুদণ্ড, কিন্তু সেই মেরুদণ্ড যদি মাদকের নেশায় নুয়ে পড়ে, তবে সে জাতি দাঁড়াবে কী করে! গ্রাম থেকে শহর, অলিগলি থেকে আভিজাত্যের ড্রয়িংরুম, সর্বত্র আজ মাদকের অবাধ বিচরণ। প্রবাদ আছে, ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’। আজকের তরুণরা নিছক কৌতূহল বা বন্ধুর পাল্লায় পড়ে যে পথে পা বাড়াচ্ছে, তা আসলে এক অন্ধকার সুড়ঙ্গ। এখানে একটি করুণ উদাহরণ টানা যায়, এক উচ্চবিত্ত পরিবারের মেধাবী সন্তান, যার চোখে ছিল ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন। বন্ধুদের আড্ডায় একদিন কৌতূহলবশত সে একটি মাদক গ্রহণ করে। সেই শুরু, এরপর ধীরে ধীরে সে তার পড়াশোনা হারালো, তার স্বপ্ন হারালো এবং শেষ পর্যন্ত নিজের মায়ের গয়না চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ল। 

এটি কেবল একটি ছেলের গল্প নয়, এটি বর্তমান সমাজের হাজারো পরিবারের নীরব কান্নার প্রতিধ্বনি। মাদক কেবল শরীর ধ্বংস করে না, এটি মানুষের বিবেক আর বিচারবুদ্ধিকেও লোপ করে দেয়। ‘কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই’, এই প্রবাদটি আমাদের দেশের মাদকবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে একদম প্রযোজ্য। কাগজে-কলমে মাদকবিরোধী অনেক আইন আছে, অনেক সংস্থা আছে, কিন্তু বাস্তবে মাদকের সহজলভ্যতা কমেনি বরং বেড়েছে। ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থাকা অসাধু সিন্ডিকেটগুলো আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের বিনিময়ে নিজেদের আখের গোছাচ্ছে। আবার মাদক কারবারিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে কোর্টে পাঠালে সপ্তাহের মধ্যে জামিনে ফিরে আসে। এই সর্বনাশা পথ থেকে তরুণদের ফিরিয়ে আনতে কেবল আইন দিয়ে হবে না, প্রয়োজন একটি বৃহৎ সামাজিক আন্দোলন। আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়’। এখনই যদি আমরা পরিবারের ভেতর থেকে প্রতিরোধ গড়ে না তুলি, তবে অচিরেই আমাদের ঘরগুলো অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হবে। আমরা যখন দেখি একজন সৎ মানুষ সমাজে অবহেলিত আর একজন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছে, তখন সাধারণ মানুষের মনে হতাশা জন্মানো স্বাভাবিক। কিন্তু এই হতাশাই অপরাধীদের পথকে আরও সুগম করে দেয়। 

প্রবাদ আছে, ‘অন্যায়ের প্রতিবাদ যে করে না, সেও অন্যায়ের সমান অংশীদার’। আমাদের এই নীরবতা ভাঙতে হবে। একদা এক বাদশাহ তার প্রজাদের আনুগত্য পরীক্ষা করার জন্য একটি বড় পাত্রে সবাইকে এক গ্লাস করে দুধ ঢালতে বলেছিলেন রাতের অন্ধকারে। সকালে দেখা গেল পাত্রটি দুধে নয়, বরং পানিতে পূর্ণ। কারণ সবাই ভেবেছিল, সবাই তো দুধ দেবে, আমি এক গ্লাস পানি দিলে কে আর বুঝবে! আমাদের সমাজটা আজ সেই পানির পাত্রের মতো হয়ে গেছে।

সমাজ পরিবর্তনের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি সত্যিকারের গণজাগরণ। তবে এই আন্দোলন কেবল রাজপথে প্লাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকা নয়, এই আন্দোলন হতে হবে আমাদের চিন্তায়, আমাদের মননে। ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’, এই সত্যটি আমাদের স্কুল থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সব স্তরে শেখাতে হবে। ডিজিটাল অপরাধী হোক বা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে শিক্ষিত। তার মানে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় গলদ রয়ে গেছে। শিক্ষা যদি মানুষকে নীতিবান না করে, তবে সেই শিক্ষা দিয়ে দেশ বা দশের কোনো কল্যাণ হয় না। বরং শিক্ষিত অপরাধীরা অশিক্ষিত অপরাধীদের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। তারা প্রযুক্তির মারপ্যাঁচ বুঝে মানুষের সাথে প্রতারণা করার নতুন নতুন কৌশল আবিষ্কার করে। ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য যেমন সচেতনতা প্রয়োজন, তেমনি সামাজিক নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন ঐক্য। ‘দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’, এই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে আমাদের এগোতে হবে। আমাদের সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেয়ার আগে তাদের হাতে নীতি-নৈতিকতার বই তুলে দিতে হবে। 

পরিশেষে বলা যায়, অন্ধকার তাড়াতে হলে কেবল অন্ধকারের নিন্দা করলেই হয় না, ছোট একটি মোমবাতি হলেও জ্বালাতে হয়। আমরা প্রত্যেকে যদি একটি করে মোমবাতি জ্বালাই, তবে সেই আলোয় আমাদের সমাজ থেকে মাদক, সন্ত্রাস আর ডিজিটাল প্রতারণার অন্ধকার দূর হয়ে যাবে। আসুন, আমরা হুজুগে না মেতে বিবেকের চর্চা করি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই এবং একটি সুন্দর ও সুস্থ পৃথিবী গড়ে তুলি। কারণ দিনশেষে ‘মানুষ মানুষের জন্য’। এই সহজ সত্যটি যদি আমরা অন্তরে ধারণ করতে পারি, তবেই আমাদের সব সংগ্রাম সার্থক হবে। চব্বিশ ঘণ্টার ডিজিটাল জীবনে একটু সময় বের করি নিজের জন্য, নিজের পরিবারের জন্য এবং এই সমাজের জন্য। তবেই আসবে সেই কাক্সিক্ষত পরিবর্তন যার স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি এবং যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট