গণতন্ত্রের অন্দরমহলে যখন সাম্যের সুর ধ্বনিত হয়, তখন নারী প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি কেবল সংখ্যার বিচার থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে একটি রাষ্ট্রের ইনসাফ ও অগ্রগতির দর্পণ। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে ক্ষমতার অলিন্দে নারীর পদচারণা ছিল সীমিত, কিন্তু সময়ের বিবর্তনে আজ বিশ্বজুড়ে আইনসভার আসনগুলোতে নারীরা তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন।
ইতিহাসের ধূলিমলিন পথ পেরিয়ে আধুনিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর এই বিবর্তন আমাদের এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়, যেখানে নারী ও পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়ার শপথ নেয়। সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বের উৎপত্তি মূলত বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অঙ্কুরিত হয়েছিল। শিল্প বিপ্লব পরবর্তী সময়ে যখন সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন ঘটে, তখন নারীরা অনুধাবন করেন যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের অনুপস্থিতি অধিকার বঞ্চিত হওয়ার প্রধান কারণ।
১৯০৬ সালে ফিনল্যান্ড বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে নারীদের কেবল ভোট দেয়ার নয়, বরং সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পূর্ণ অধিকার প্রদান করে ইতিহাস সৃষ্টি করে। এই সূচনালগ্নটি ছিল শতাব্দীর অবদমিত আকাক্সক্ষার এক সশব্দ বিস্ফোরণ, যা পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকায় নারী প্রতিনিধিত্বের দাবি জোরালো হতে থাকে। ১৯১৮ সালে যুক্তরাজ্যে সীমিত পরিসরে এবং ১৯২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ আইনসভার দুয়ার খুলে দেয়। তবে এই পথচলা ছিল কণ্টকাকীর্ণ; সামাজিক রক্ষণশীলতা আর পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বেড়াজালে পিষ্ট হয়ে অনেক দেশে নারী সংসদ সদস্যদের আসন পেতে দশকের পর দশক অপেক্ষা করতে হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র এবং বৈশ্বিক মানবাধিকার আন্দোলন নারী প্রতিনিধিত্বকে একটি আবশ্যিক গণতান্ত্রিক মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বিবর্তনের ধারায় নারী প্রতিনিধিত্ব আজ কেবল ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণ’ থেকে ‘সংরক্ষিত কোটা’ এবং ‘স্বেচ্ছাসেবী দলীয় কোটা’র পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। সত্তর ও আশির দশকে নর্ডিক দেশগুলো যখন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থায় নারীদের জন্য আসন নিশ্চিত করা শুরু করে, তখন সারা বিশ্বে এক নতুন মডেলের জন্ম হয়। বর্তমানে অনেক দেশে সরাসরি নির্বাচনের পাশাপাশি কোটা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে যাতে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় জেন্ডার ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।
রুয়ান্ডায় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতি বিশ্বের জন্য এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে সংবিধানে নিন্ম কক্ষে অন্তত ৩০ শতাংশ আসন নারীর জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। এখানে সরাসরি ভোটের পাশাপাশি বিশেষ নির্বাচনী কলেজের মাধ্যমে নারীরা নির্বাচিত হন, যার ফলে বর্তমানে দেশটির সংসদে নারী সদস্যের হার বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। সুইডেনে কোনো আইনি কোটা নেই, তবে রাজনৈতিক দলগুলো স্বেচ্ছায় ‘জিপার সিস্টেম’ অনুসরণ করে, যেখানে প্রার্থী তালিকায় একজন পুরুষের পর একজন নারী রাখা হয়। কিউবার নির্বাচনী পদ্ধতি অনুযায়ী তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রার্থী বাছাই করা হয় এবং সেখানে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। তাদের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে অর্ধেকের বেশি সদস্য নারী।
নিউজিল্যান্ডে মিশ্র আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যা নারীদের সংসদে আসার পথ সুগম করেছে। ভোটাররা এখানে দুটি ভোট দেন- একটি দলের জন্য এবং একটি প্রার্থীর জন্য। মেক্সিকোয় নির্বাচনী আইনে জেন্ডার প্যারিটি বা লিঙ্গ সমতাকে কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রতিটি নির্বাচনে সমান সংখ্যক নারী ও পুরুষ প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হয়।
স্পেনে জেন্ডার প্যারিটি আইন অনুযায়ী কোনো লিঙ্গই নির্বাচনী তালিকার ৬০ শতাংশের বেশি বা ৪০ শতাংশের কম হতে পারবে না।
আইসল্যান্ডে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে নারীরা বিপুল সংখ্যায় সংসদে আসছেন। যদিও সেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক কোটা নেই, তবে সামাজিক সচেতনতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা দেশটিকে নারী নেতৃত্বের শীর্ষে রেখেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ক্ষমতাসীন দল এএনসি স্বেচ্ছায় ৫০ শতাংশ কোটা নীতি গ্রহণ করায় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্ণবাদ বিরোধী লড়াইয়ের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এই দেশটি লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতেও সমানভাবে সোচ্চার। দলীয় তালিকার মাধ্যমেই এখানে অধিকাংশ নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
আর্জেন্টিনায় ১৯৯১ সালে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে আইনসভার জন্য কোটা পদ্ধতি চালু করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে তারা লিঙ্গ সমতা আইন পাস করে, যেখানে প্রার্থী তালিকায় নারী ও পুরুষের সমান সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বলিভিয়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দেশ যেখানে সংসদে নারী ও পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান। তাদের সংবিধানেই প্রার্থী তালিকায় জেন্ডার প্যারিটি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়া আছে।
ফিনল্যান্ডে দলীয় তালিকার আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে নারীরা নির্বাচিত হন। বেলজিয়ামে আইন অনুযায়ী নির্বাচনী তালিকায় শীর্ষ দুটি পদের একটি অবশ্যই নারীর জন্য বরাদ্দ থাকতে হয়। এই ‘জিপার লিস্ট’ পদ্ধতি নিশ্চিত করে যে নারী প্রার্থীরা কেবল তালিকার শেষে থাকবেন না, বরং জয়ের সুযোগও পাবেন। ডেনমার্কে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব সদিচ্ছা ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামোর কারণে নারীরা সংসদে আধিপত্য বিস্তার করছেন। ১৯৭০-এর দশকে কোটা ব্যবস্থা থাকলেও এখন আর তার প্রয়োজন পড়ছে না, কারণ নারীরা এখন নিজেদের যোগ্যতায় আসন ছিনিয়ে নিচ্ছেন। ফ্রান্সে ২০০০ সালে পাস হওয়া প্যারিটি আইন অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনে দলগুলোকে সমান সংখ্যক নারী ও পুরুষ প্রার্থী দিতে হয়। যদি কোনো দল এটি অমান্য করে, তবে তাদের সরকারি অনুদান কমিয়ে দেয়া হয়।
সুইজারল্যান্ডে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের চর্চা থাকলেও নারীদের ভোটাধিকার পেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। তবে বর্তমানে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির মাধ্যমে নারীরা সংসদে তাদের অবস্থান দৃঢ় করেছেন। জার্মানিতে মিশ্র নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে নারীরা সরাসরি এবং দলীয় তালিকা- উভয় মাধ্যমেই সংসদে প্রবেশ করেন। দেশটির প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নিজস্বভাবে কোটা পালন করে থাকে।
আফগানিস্তানে (অতীতের কাঠামো অনুযায়ী) সংবিধানে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট আসন সংরক্ষিত ছিল। সাধারণত প্রতিটি প্রদেশ থেকে অন্তত একজন নারী সদস্য নির্বাচনের নিয়ম ছিল। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই কাঠামো সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে পড়েছে। পাকিস্তানের সংসদে সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থার মাধ্যমে নারীরা প্রতিনিধিত্ব করেন। সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি দলগুলো তাদের প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী মনোনীত করে। ভারতে বর্তমানে লোকসভা ও বিধানসভায় ৩৩ শতাংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণের আইন পাস হয়েছে। এর আগে কেবল স্থানীয় সরকার বা পঞ্চায়েতে এই কোটা কার্যকর ছিল। নেপালে মিশ্র নির্বাচনী পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যেখানে সংসদে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। সরাসরি নির্বাচনের পাশাপাশি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে নারীরা নির্বাচিত হন।
দক্ষিণ এশিয়ায় নেপাল নারী প্রতিনিধিত্বে বেশ অগ্রগামী। শ্রীলঙ্কায় স্থানীয় সরকার পর্যায়ে ২৫ শতাংশ কোটা থাকলেও জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য কোনো আইনি সংরক্ষণ নেই। নারী প্রার্থীরা সরাসরি সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়ে আসেন। ভুটানে জাতীয় পরিষদে নারীদের অংশগ্রহণের জন্য সরাসরি নির্বাচন পদ্ধতি কার্যকর। যদিও সেখানে কোনো নির্দিষ্ট কোটা নেই, তবে সরকার ও নির্বাচন কমিশন নারীদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করে থাকে। মালদ্বীপে নারী প্রতিনিধিত্বের হার দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম আসনগুলোর মধ্যে একটি। এখানে নারীরা সরাসরি সাধারণ নির্বাচনে পুরুষদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে সংবিধানে ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে, যা সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে দলগুলোর মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হয়। এই পদ্ধতিটি ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে প্রবর্তিত হয়েছিল, যা কয়েক দফায় মেয়াদ ও আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাংলাদেশের এই সংরক্ষিত আসনগুলোতে কোনো সরাসরি ভোট হয় না; বরং সাধারণ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ভোটার হিসেবে কাজ করেন। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মনোনীত নারী প্রার্থীদের তালিকা প্রদান করে এবং আসন সংখ্যার অনুপাতে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এই প্রক্রিয়ায় নারীদের জন্য সংসদে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়। সরাসরি সংরক্ষিত আসনের পাশাপাশি বাংলাদেশের নারীরা সাধারণ আসনে সরাসরি নির্বাচন করারও সুযোগ পান।
নির্বাচন কমিশন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সাধারণ নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়ে থাকে। ফলে বাংলাদেশের সংসদ বর্তমানে সংরক্ষিত ৫০ জন এবং সরাসরি নির্বাচিত নারী সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত হয়।
বাংলাদেশে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যরা সরাসরি জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসেন না বলে তাদের এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। সরাসরি ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের সাথে তাদের সরাসরি দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতার জায়গাটি ক্ষীণ থাকে। এই প্রেক্ষাপটে তারা যখন সংসদে কোনো বিষয়ে কথা বলেন, তখন তাদের কণ্ঠস্বরে সেই গণদাবির তেজ অনেক সময় প্রতিফলিত হয় না, যা একজন সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধির ক্ষেত্রে দেখা যায়।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক




Comments