মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব! এখন এই কথাটা লিখলে বাক্যের শেষে দাঁড়ি দিতে হয় না। বিস্ময়বোধ জাগে। সত্যিই কি মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব? একবার চারদিকটা দেখুন। এই সৃষ্টি কত সুন্দর- পাহাড়, পর্বত, গাছপালা, সমুদ্র, নদী, আকাশ, কত বিচিত্র প্রাণী। সব মিলিয়ে স্রষ্টার অনন্য স্নিগ্ধ সৃষ্টি। অপরদিকে স্রষ্টা এই মানবকে যে এত ক্ষমতা দিয়েছেন তাদের সৃষ্টি দেখুন। পারমাণবিক বোমা যা দিয়ে নিমিষেই এই পৃথিবী ধ্বংস করা সম্ভব!
এছাড়া বায়ুদূষণ, পরিবেশ দূষণ, গাছপালা কেটে বন উজাড় করা এই হচ্ছে মানুষ। অথচ মানুষের প্রধান দায়িত্ব এই সৃষ্টিকে রক্ষা করা। কিছু কিছু বিগড়ে যাওয়া সন্তানরা, সবকিছুকে বাপের সম্পত্তি মনে করে তা ভোগের নামে নষ্ট করে। মানুষ যেন প্রকৃতির সেই বিগড়ে যাওয়ার সন্তান। মানুষের মতে এই পৃথিবীতে বসবাসের অধিকার যেন শুধু তাদের! তাই দিনের পর দিন উন্নয়নের নামে গাছ কাটছে। ফলে শুধু নিজেদের ক্ষতি করছে তা না।
এর ফলে ক্ষতি হচ্ছে লক্ষ লক্ষ প্রজাতির প্রাণীর। এই পৃথিবীতে প্রতিটি প্রাণীর বাঁচার অধিকার আছে এবং তাদের নির্দিষ্ট ভূমিকা আছে। যদি কোনো প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে প্রকৃতিতে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। অথচ মানুষ ভেবে রেখেছে এই পৃথিবী তাদের পৈতৃক সম্পত্তি। মানুষ নিষ্ঠুরভাবে অন্যান্য প্রাণীকে হত্যা করছে। খাওয়ার উদ্দেশ্যে যেসব প্রাণীকে মেরে বিক্রি করা হয়, এখানে সেসবের কথা বলছি না। আমি বলছি প্রাণীদের অকারণে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে ফেলে দেয়ার কথা। প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে অমুক ব্যক্তি সদ্য জন্ম নেয়া কুকুরের বাচ্চাদের বস্তায় বন্দি করে, জলাশয়ে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে।
কয়েক মাস আগে সান্ডা নামে গুজব ছড়িয়ে, গুঁইসাপকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করার দৃষ্টান্তও আমরা দেখেছি। আবার প্রায়ই দেখা যায় কুকুর নিধনের প্রকল্প! কুকুরের বাচ্চা বা বিড়ালের বাচ্চা জন্ম নিয়েছে, তারা মানুষের জন্য ক্ষতিকর হবে এই অজুহাত দেখিয়ে অসহায় প্রাণীগুলোকে মেরে ফেলা হচ্ছে! এই প্রবণতা কবে শেষ হবে? এসব নিষ্ঠুরতার শেষ কোথায়? এই পৃথিবীতে কি শুধুই মানুষের অধিকার আছে? এখন নিরীহ পশুদের বাঁচাতে আমাদের পশু সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। বিভিন্ন দেশে প্রাণীদের নিরাপত্তা দানে আইন তৈরি করা হয়েছে। যেমন-
ভারততে ‘Prevention of Cruelty to Animals Act, 1960’ প্রাণীর প্রতি নির্যাতন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। যুক্তরাজ্যে ‘Animal Welfare Act, 2006’ প্রাণীর খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। যুক্তরাষ্ট্রে ‘Animal Welfare Act, 1966’ গবেষণাগার ও চিড়িয়াখানায় প্রাণীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। জার্মানিতে প্রাণী সুরক্ষা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত; প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণে কঠোর শাস্তি। অস্ট্রেলিয়ায় প্রাণী নির্যাতনের জন্য জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। বাংলাদেশেও এই আইন রয়েছে। বাংলাদেশে প্রাণী সুরক্ষার জন্য প্রধান আইন হলো ‘Animal Welfare Act 2019’ (প্রাণী কল্যাণ আইন, ২০১৯)। এই আইনের মাধ্যমে প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধ এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এর প্রয়োগ তেমন দেখা যায় না। তবে বর্তমানে সময় এসেছে এই আইন সংশোধন করে, প্রাণী নির্যাতনের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা। সাথে সাথে পরিবারে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নৈতিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে। তাদের বুঝাতে হবে এই পৃথিবীতে মানুষের বাঁচার যতটা অধিকার, অন্যান্য প্রাণীদেরও সমান অধিকার রয়েছে। পশু-পাখিদের প্রতি সহনশীল আচরণ করা, তাদের ভালোবাসতে শেখানো অভিভাবক ও শিক্ষকদের দায়িত্ব।
স্বামী বিবেকানন্দের অন্যতম বাণী হলো, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’ এটা শুধু সনাতন ধর্মের কথা নয়। সকল ধর্মে স্রষ্টার সৃষ্টিকে ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে।
আল-কুরআন, সূরা আল-আন‘আম, আয়াত ৩৮
এখানে বলা হয়েছে যে পৃথিবীর সব প্রাণী ও আকাশে উড়ন্ত পাখিরা মানুষের মতোই আল্লাহর সৃষ্টি এবং তারা নিজ নিজভাবে জীবনযাপন করে। এখানে ইসলাম ধর্মেও জীব প্রেমের গুরুত্ব স্পষ্ট। ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে বোঝাতে হবে এই পৃথিবীতে সকল জীবের সমান অধিকার। তাই এই জীবদের রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ আমাদের গ্রহণ করতে হবে। তবেই একটি সুন্দর পৃথিবী গঠন সম্ভব।
লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়




Comments