অর্থনীতি নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না। বৈশ্বিক টানাপড়েনের সাথে অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো মিলিয়ে অর্থনীতি সংকটে রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে। টানা তিন বছরই কমছে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। অন্যদিকে বেড়ে চলেছে দারিদ্র্য। প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক পতন, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানে ধীরগতি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা ব্যাহত করছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে কয়েক লাখ মানুষ। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধ না হলে এ সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।
‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থনীতির চাপে থাকার এ চিত্র উঠে এসেছে। জীবন ব্যবস্থা চাপে থাকলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। এর মধ্যেই আসছে বাজেট। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দুর্বল প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের গভীর দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সম্মিলিত চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা এখন নড়বড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈশ্বিক সংঘাতের প্রভাব। সামনের দিনগুলোতে এসব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, টানা তিন বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রব্রদ্ধি কমে দাঁড়াতে পারে ৩.৯ শতাংশে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, কম রাজস্ব আদায় এবং বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি ও প্রবাসী আয় হ্রাস এবং বৈদেশিক লেনদেনে চাপ তৈরির মতো সমস্যা হচ্ছে। এতে করে দেশের সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ অবস্থানে রয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮.৫ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। ফেব্রুয়ারিতে তা আরও বেড়ে ৯ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছায়। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।
দারিদ্র্যের চিত্রও উদ্বেগজনক। যদিও সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দারিদ্র্যতার চাপ কমাতে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে যেখানে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, তা বেড়ে ২০২৫ সালে ২১.৪ শতাংশে পৌঁছেছে। টানা তিন বছর দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এদিকে আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়ে চলেছে। আমদানির বিপরীতে যদি রপ্তানি বাণিজ্য বাড়ানো না সম্ভব হয় তাহলে রিজার্ভ শক্তিশালী হয় না, অর্থনীতির গতি স্থিমিত হয়ে আসে। দেশের বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এই ঘাটতি ছিল ১১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক বছরে ঘাটতি বেড়েছে ২ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ১৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশ থেকে মোট ২৬ দশমিক শূন্য ৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। একই সময়ে আমদানি হয়েছে ৩৯ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। আগের অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ২৬ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ব্যয় ছিল ৩৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রথম সাত মাসে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ১ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ আমদানির তুলনায় রপ্তানি কম থাকায় এই বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সা¤প্রতিক সময়ে আমদানি বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। রমজানকে কেন্দ্র করে খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের আমদানি বেড়েছে। পাশাপাশি শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানিও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে দেশের আর্থিক হিসাবে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্ত ছিল ৩৩১ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যেও উন্নতি হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে ২ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ১ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি ছিল। ২০২৩ সালের ৫ আগষ্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে দেশ পরিচালিত হয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। নতুন সরকার, নতুন পরিস্থিতি এবং নতুন যাত্রা। সবার আগে হাল ফেরাতে হবে দেশের অর্থনীতির।
কারণ অর্থনীতি শক্তিশালী না হলে বা অর্থনীতিতে স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ না করলে কোনো অবস্থাতেই দেশে সার্বিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। আর অর্থনীতির সাথে অপরাপর যে বিষয়গুলো জড়িয়ে আছে সেগুলো হলো- বেকারত্ব সমস্যা, শিল্প ও কলকারখানায় গতি, বৈদেশিক বিনিয়োগ, বাজার মূল্য বা মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা এবং নিন্মজীবীদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা। এর সাথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং বিষয় হলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে করা পে কমিশনের সুপারিশ অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা।
অর্থাৎ অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে নতুন সরকারের। দেশের অর্থনীতি সবসময় শুধু দেশের অবস্থার উপর নির্ভর করে না বরং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের উপরও নির্ভর করে। গত বছর থেকেই পৃথিবী যুদ্ধের ময়দানে রয়েছে। যুদ্ধ মানেই অর্থনীতিতে আঘাত। কোথাও না কোথাও অর্থনীতি এ ধরনের যুদ্ধাবস্থাতে ভুগবেই।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কর্তৃক প্রকাশিত অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৬ সালের বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে থাকবে এবং তাদের বার্ষিক গড় আয় ৩১.৮ ট্রিলিয়ন ডলার হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এরপরেই ২০২৬ সালে ২০.৬ ট্রিলিয়ন মাার্কিন ডলার অর্থনীতি নিয়ে চীন এবং ৫.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি নিয়ে য জার্মানি থাক্রমে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থানে অপরিবর্তিত থাকবে। ভারত ৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি নিয়ে ২০২৫ সালে জাপানকে ছাড়িয়ে চতুর্থ স্থানে পৌঁছেছে এবং ২০২৬ সালেও একই অবস্থান ধরে রাখবে। প্রশ্ন হলো এখানে বাংলাদেশের অবস্থান কি হবে? প্রায় দেড় বছরের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং জ্বালানি ঘাটতির কারণে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে আসে।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে এক অঙ্কে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনেও বড় পতন দেখা যায়। বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৬ অর্থবছরে ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এই পূর্বাভাস আগের বছরের চেয়ে সামান্য বেশি। এডিবি তাদের সর্বশেষ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, পোশাক রপ্তানি ঠিক আছে, কিন্তু দেশের মধ্যে চাহিদা কমে থাকার কারণে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধীর হবে। এর পেছনে রয়েছে চলমান রাজনৈতিক পরিবর্তন, বারবার বন্যা, শিল্প খাতে শ্রম বিরোধ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
মাস্টারকার্ড এর তথ্য মতে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.১% হতে পারে, যা আগের বছরের তুলনায় সামান্য কম হলেও সম্প্রসারণের ধারা অব্যাহত থাকবে। পূর্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের ক্যাটাগরিতে উন্নীত হবে। এতে অনেক রকম বাণিজ্যিক সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে।
তখন একদিকে যেমন বাংলাদেশের ঋণমান বাড়বে; ঠিক তেমন বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান প্রাপ্তি সংকুচিত হয়ে আসবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের সুদও বাড়বে নিয়ম মোতাবেক। অনেক বাজারে হয়তো এখনকার মতো সহজ শুল্কমুক্ত সুবিধাও থাকবে না, যদিও ২০২৬ সালের পরের তিন বছর পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধাগুলো বহাল রাখার চেষ্টায় আছে বাংলাদেশ। তা না হলে বাংলাদেশ একটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। অর্থনীতির গতি ফেরাতে রপ্তানি আয় আমদানির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
অর্থাৎ ঘাটতি বাণিজ্য কমাতে হবে। যেসব পোশাক কারখানা নানা সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে সেসব কারখানা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের ঋণ খেলাপিদের খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সেই সাথে এই খেলাপি ঋণ যেনো আর পাহাড় সমান উঁচু না হয় সেদিকে কঠোর নজরদারি করতে হবে। সামনে একটি বিশাল অংকের বাজেট আসছে। সেই বাজেটের চাহিদা পূরণে অর্থনীতির গতি ফেরানোর কার্যকরী উদ্যোগের বিকল্প নেই।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট




Comments