যাদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন, জেল খেটেছেন; সেই অগণিত মানুষের চোখের জল, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় বিদায় নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল বুধবার বেলা ৩টা ২ মিনিটে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত জানাজা রূপ নেয় জনসমুদ্রে। দেশে অনুষ্ঠিত স্মরণকালের এই জানাজায় রাজধানী ঢাকা ভেসেছিল জনতার স্রোতে। এর আগে কোন রাষ্ট্রপ্রধানের জানাজায় এতো সংখ্যক মানুষ শরিক হতে দেখা যায়নি।
রাজধানীর রাজপথ গতকাল কথা বলেছে। তবে সে ভাষা স্লোগানের নয়, বরং গভীর শোকের। ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে যাওয়া এক মুহূর্তের সাক্ষী হলো বাংলাদেশ। গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজাকে কেন্দ্র করে ঢাকা গতকাল রূপ নিয়েছিল এক বিশাল জনসমুদ্রে। চোখ যেদিকেই গেছে, সেদিকেই ধরা পড়েছে কেবল মানুষের ভিড় আর অশ্রুসিক্ত মুখ। জনসমুদ্রের ব্যাপ্তি আকাশ থেকে তোলা ড্রোন ফুটেজে দেখা যায়, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাপিয়ে শাহবাগ এবং মহাখালী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল মানুষের মাথা। কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ নয়, বরং প্রিয় নেত্রীকে এক নজর দেখার এবং শেষ বিদায় জানানোর আকুলতা নিয়ে মানুষ জমায়েত হয়েছিল এই বিস্তৃত এলাকায়। ধরা পড়ে সেই বাঁধভাঙা জোয়ার, যা স্মরণকালের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। আর ফাটো সাংবাদিকদের ছবিতে ধরা পড়েছে লাল-সবুজের পতাকায় মোড়ানো কফিনে নেত্রীর শেষ যাত্রার সেই বিষন্ন মুহূর্ত, যা দেখে লাখো মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। কূটনৈতিক সম্মান ও রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে বিদায় কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেখা গেছে বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি দলের সরব উপস্থিতি।
আসাদ গেট থেকে মোহাম্মদপুর টাউন হলের কাছাকাছি পর্যন্ত, আগারগাঁও মেট্রো স্টেশন থেকে শিশু মেলার (শ্যামলী) কাছাকাছি পর্যন্ত এলাকার সড়কে বিপুল মানুষ জানাজায় অংশ নেন। বিকাল ৪টা ১০মিনিটে বিএনপির মিডিয়া সেলের এক ফেসবুক পোস্টে বলা হয়, ইতিহাসের বৃহত্তর জানাজা। বিরল সম্মানে অভিষিক্ত গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। জানাজাস্থল ছাড়িয়ে কারওয়ান বাজার -মগবাজার - মোহাম্মদপুর - গাবতলি হয়ে আশপাশের এলাকা-গলি যত দূর চোখ যায় লোকে লোকারণ্য। কোটি মানুষের অংশগ্রহণে ভালোবাসায় সিক্ত সকলের প্রাণপ্রিয় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
শেষ যাত্রার পূর্ণতা বিকালে জানাজা শেষে যখন প্রিয় নেত্রীকে কবরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন হাজারো মানুষের হাত তোলার দৃশ্য সবাই যেন শেষবারের মতো তার মাগফিরাত কামনা করছিলেন। এই দৃশ্যপটগুলো কেবল সংবাদ নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য দলিল হয়ে থাকবে।
এদিকে জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের মাঠ, বাইরের অংশ এবং পুরো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাড়িয়ে আশপাশের সব সড়ক, অলিগলি থেকে অজস্র মানুষ জানাজায় অংশ নিয়েছেন। জানাজায় অংশগ্রহণের জন্য নারীদের জন্য রাখা হয় বিশেষ ব্যবস্থা। জানাজা পড়ান বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব আবদুল মালেক। আর সঞ্চালনা করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে দেড় দশকের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার সাড়ে চুয়াল্লিশ বছর আগে যেখানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে সমাহিত করা হয়েছে, সেই জিয়া উদ্যানে স্বামীর পাশেই শায়িত করা হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে। গতকাল বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টায় বিএনপি চেয়ারপারসনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
এ সময় কিছুটা দূরত্বে সেখানে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথিসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। এর বাইরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সেখানে দাঁড়িয়ে দাফন প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেন।
এই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেই ১৯৮১ সালের ২ জুন খালেদা জিয়ার স্বামী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজা হয়েছিল। পরে তাকে সমাহিত করা হয় জিয়া উদ্যানে। গতকাল সকালে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে খালেদা জিয়ার কফিন নেয়া হয় গুলশানে তার ছেলে তারেক রহমানের বাড়িতে। পরে জাতীয় পতাকা শোভিত লাশবাহী গাড়ি বেলা পৌনে ১২টার দিকে সংসদ ভবনের সামনে পৌঁছায়। গাড়িবহরে একটি বাসে করে সেখানে পৌঁছান খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা। বাদ জোহর খালেদা জিয়ার জানাজা হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই সংসদ ভবন এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়। জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া চলাকালে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনুমতি ছাড়া কাউকে সংসদ ভবনের উত্তর প্লাজায় প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।
জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের পাশাপাশি অংশগ্রহণ করেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীপ্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন।
জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বাম পাশে দাঁড়ান তারেক রহমান, তারপরে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং তারপরে দাঁড়ান নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার।
আর সরকারপ্রধানের ডান পাশে দাঁড়ান প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, তারপরে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এবং তারপরে ছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীপ্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। প্রধান উপদেষ্টার পাশাপাশি তার সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান, ফাওজুল কবির খান, আ ফ ম খালিদ হোসেন, আলী ইমাম মজুমদার, সি আর আবরার, এম সাখাওয়াত হোসেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমকেও জানাজায় দেখা গেছে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ বিএনপির সর্বস্তরের নেতারকর্মীরা জানাজায় শরিক হোন।
জানাজায় দেখা গেছে কবি ও তাত্ত্বিক ফরহাদ মজহারকে। রাজনীতিকদের মধ্যে জামায়াত ইসলামীর মিয়া গোলাম পরওয়ার, শামীম সাঈদী, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মামুনুল হক, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ও গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরকে দেখা গেছে। ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের আহমাদুল্লাহও বিএনপি নেত্রীর জানাজায় অংশ নেন।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাবিক, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুঙ্গেল, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতির উচ্চ শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী আলি হায়দার আহমেদ, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ। চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন মিশনের প্রধানরাও তাদের দেশের পক্ষে খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে শেষ যাত্রায় অংশ নিয়েছেন।
গেল বছরের ৩০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, ‘আপসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়া। ৭৯ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে আর্থরাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদ্?যন্ত্র, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন তিনি। কিন্তু পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ২৩ নভেম্বর আবার হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় তাকে। দেড় মাসের মতো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মারা যান। তার মৃত্যুতে দেশে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক চলছে, বুধবার ঘোষণা করা হয়েছে সাধারণ ছুটি।
স্বামী জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির হাল ধরেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া, তখন তিনি নিতান্তই একজন গৃহবধূ। তিনি ১৯৮৪ সালের অগাস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন, আমৃত্যু তিনি সে দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সাতদলীয় জোট গঠন করে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলনে এরশাদ সরকারের সঙ্গে কখনো আপস করেননি খালেদা। অন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতা করলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি কোনো সমঝোতায় যায়নি। তাই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার নাম হয় আপসহীন নেত্রী।
গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে ৪৩ বছর দলকে নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৮৪ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপাসন নির্বাচিত হন। এরপর থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন খালেদা জিয়া।
বিএনপি চেয়ার-পারসনের দায়িত্বে থাকার পাশাপাশি তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস গড়েন। চার দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়াকে কখনো তার বিরোধীদের আক্রমণ করে কথা বলতে দেখা যায়নি। এ নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আমি কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণ করে কথা বলি না।
খালেদা জিয়াকে গার্ড অব অনার তিন বাহিনীর: রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শেষ বিদায় সম্পন্ন হয়েছে। বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিটে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান (গার্ড অব অনার) জানানো হয়।




Comments