Image description

বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে এভারকেয়ার হাসপাতালে বেগম খালেদা জিয়ার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের মধ্য দিয়ে। ৩১ ডিসেম্বর লাখো মানুষের উপস্থিতিতে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখন প্রবেশ করেছে এক নতুন বাস্তবতায়—যাকে বিশ্লেষকরা বলছেন ‘খালেদা জিয়া-উত্তর’ যুগ। এই নতুন যুগে দলের একক কাণ্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তাঁর সন্তান তারেক রহমান। তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তাঁর সামনে রয়েছে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ।

১. নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও নৈতিক ভারকেন্দ্র: বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়া কেবল বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন না, তিনি ছিলেন দলের ঐক্যের প্রতীক ও ‘নৈতিক অভিভাবক’। তাঁর উপস্থিতির কারণে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল কখনো বড় আকার ধারণ করতে পারেনি। লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, "খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কারিশমা দলটিকে ঐক্যবদ্ধ রাখত। এখন তারেক রহমানকে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজের নেতৃত্ব প্রমাণ করতে হবে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাঁর জন্য ভাগ্যনির্ধারক হতে পারে।"

২. নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়া: দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তারেক রহমানের নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার পর এবারের নির্বাচনি সমীকরণ ভিন্ন। এখন আর দুই দলের পুরোনো আধিপত্য নেই। বিএনপিকে এখন লড়তে হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী এবং ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের তরুণ নেতাদের গড়া ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ বা এনসিপি-র মতো নতুন শক্তির বিরুদ্ধে। এই প্রতিযোগিতামূলক মাঠে দলকে বিজয়ী করে আনাই হবে তারেক রহমানের প্রধান লক্ষ্য।

৩. অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও সংস্কার: তারেক রহমানের সামনে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা। সম্প্রতি কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠলেও বিএনপির পক্ষ থেকে তা অস্বীকার বা কঠোরভাবে দমনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। দলের উপদেষ্টা মাহদী আমিনের মতে, বিএনপি নির্বাচিত হলে খালেদা জিয়ার নীতি ও ৩১ দফার সংস্কার কর্মসূচির ভিত্তিতে সুশাসন নিশ্চিত করবে। তবে এই সংস্কারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করাই হবে বড় পরীক্ষা।

৪. জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে সমন্বয়: দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা তারেক রহমানের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। চকরিয়া উপজেলা যুবদলের নেতা কামাল উদ্দিনের মতে, "খালেদা জিয়া বা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কাজ করা জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে মতভেদ দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এটি একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে।" তারেক রহমান দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরায় এই বিভক্তির আশঙ্কা কমেছে বলে মনে করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী।

৫. জিয়া ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার: তারেক রহমানকে কেবল উত্তরাধিকারী হলে চলবে না, তাকে তাঁর বাবা জিয়াউর রহমানের ‘জনগণের রাজনীতি’র আদর্শও বহন করতে হবে। কিশোরগঞ্জের প্রবীণ সমর্থক দুলাল মিয়ার ভাষায়, "তারেক রহমানকে তাঁর মা-বাবার সেই উত্তরাধিকার বহন করতে হবে। যদি তিনি তা না করেন, মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবে।"

তারেক রহমান ২০০৮ সাল থেকে প্রবাসে থাকার পর ২০২৫ সালের শেষে দেশে ফিরেছেন। তিনি ইতোমধ্যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং স্বৈর্তন্ত্র বর্জনের ডাক দিয়ে সমর্থকদের আশ্বস্ত করেছেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতে, "তাঁর নেতৃত্ব ইতিমধ্যে প্রমাণিত।" তবে সামনের দিনগুলোতে দলের শৃঙ্খলা রক্ষা, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করাই হবে তারেক রহমানের নেতৃত্বের চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা।

নতুন বছরের এই সূচনালগ্নে অভিভাবকহীন বিএনপিকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই এখন তারেক রহমানের মূল রাজনৈতিক মিশন।

মানবকন্ঠ/আরআই