বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতার জট খুলছে। ঘোষণা হতে পারে যেকোন সময়। সম্মতি দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির রেজাউল করিম পীর সাহেব চরমোনাই। ফলে কাটলো জোটের বাধা। জোটের আসন সমঝোতার ঘোষণা হতে পারে শীগ্রই। গত দু’ সপ্তাহ থেকে জামায়াতের ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতার জট লেগেই ছিল। কোন দল কতটি আসনে লড়বে, তা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করেছিল।
কিন্তু জোট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসন ভাগাভাগির এই সমীকরণে মূল ‘কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। তাদের অতিরিক্ত আসন পাওয়ার চাপের কারণেই সমঝোতা শেষ পর্যায়ে এসে থমকে গিয়েছিল। এদিকে আসন সমঝোতার জোটে থাকা শরিক একটি রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র গতকাল মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘ইসলামী আন্দোলন জোটের আলোচনায় জট পাকিয়ে আসন সমঝোতার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করেছিল।
দলটিকে জোটের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শক্তি হিসেবে সম্মান দেয়া হচ্ছে, কিন্তু তাদের চাহিদা আরও বেশি। অথচ সংসদে তাদের কখনোই প্রতিনিধিত্ব ছিল না। একক নির্বাচনে ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রেও দলটির শতাংশের হার বেশ নাজুক।
তিনি আরও বলেন, আসন শুধু চাইলেই হবে না, জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করতে হলে জয়ের কোনো বিকল্প নেই। তাই জয়ের সমীকরণ মাথায় রেখে ইসলামী আন্দোলন আসন সমঝোতার পথে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন এই নেতা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই নেতা বলেন, জোট রক্ষার স্বার্থে ইসলামী আন্দোলনের আমীর রেজাউল করিম চরমোনাইপীর ছাড়াকাট দিয়ে সম্মতি দিয়েছেন। এখন আর জোটের আসন ঘোষণা বাধা রইলো না।
অপরদিকে আসন সমঝোতা প্রক্রিয়া ও ১১ দলের মধ্যে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালনকারী শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবারের মধ্যে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জোটের একক প্রার্থী ঘোষণার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে। দ্রুতই আসন সমঝোতার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষ্কার করা হবে। আসন সমঝোতায় কোনো জট বা শঙ্কা দেখছেন না যুগপৎ আন্দোলনের শরিক অন্যতম দল জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান। বরং বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের চেয়ে নিজেদের জোটকে এগিয়ে রাখছেন তিনি।
জাগপার চেয়ারম্যান রাশেদ প্রধান বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘এক বাক্সে ভোট’ ফর্মুলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত জোটের আসন সমঝোতার জট এ সপ্তাহে কাটছে। আসন নিশ্চিতে শেষ মুহূর্তেও দরকষাকষি ও পর্যালোচনা চলছে। তবে প্রক্রিয়াটি কোথাও আটকে নেই। সমঝোতা শতভাগ না হলেও ৯৯ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। মাত্র সামান্য কিছু আসনে দরকষাকষি চলছে, যেখানে ইসলামী আন্দোলন, জামায়াত ও খেলাফত মজলিসের প্রার্থী রয়েছেন। আলোচনার মাধ্যমে এটিও সমাধানের পথে।
জামায়াতের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জোটভুক্ত দলগুলোর নির্বাচনী আসন সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। দলভিত্তিক আলাদা আলাদা বৈঠক চলছে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই আসন সমঝোতার বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে বলে তারা আশা করছেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করতে গত কয়েক দফায় দফায় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে আট রাজনৈতিক দল।
দলগুলো হলো; বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। এরপর গত ২৮ ডিসেম্বর এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সেই আসন সমঝোতার জোটে যুক্ত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। সব মিলিয়ে জোটে দলের সংখ্যা এখন ১১।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আসন সমঝোতার আলোচনার মধ্যেও জামায়াত ২৭৬, ইসলামী আন্দোলন ২৬৮, এনসিপি ৪৭, এবি পার্টি ৫৩, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪, খেলাফত মজলিস ৬৮, এলডিপি ২৪, খেলাফত আন্দোলন ১১, নেজামে ইসলাম পার্টি ৬, জাগপা ৩ এবং বিডিপি দুটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বাতিল হওয়া মনোনয়নের আপিল নিষ্পত্তি গত শনিবার শুরু হয়েছে। চলবে ১৮ জানুয়ারি রোববার পর্যন্ত। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি মঙ্গলবার। প্রতীক বরাদ্দের তারিখ ২১ জানুয়ারি বুধবার।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জামায়াত চায় ১৯০টি আসন নিজেদের জন্য ধরে রাখতে। বাকি সব আসন জোটের শরিকদের জন্য ছেড়ে দিতে চায়। এর মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের জন্য সর্বোচ্চ ৪০টি, এনসিপি ৩০, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১৫, খেলাফত মজলিস ৭, এলডিপি ৫ বা ৭টি, এবি পার্টি তিনটি এবং বিডিপিকে দুটি আসন ছাড় নিয়ে কথা এগিয়েছে। এ অবস্থারর মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে গত কয়েক দিনে একাধিক বৈঠক হয়েছে। যেখানে ইসলামী আন্দোলন অন্তত ১০০ আসনে ছাড় পাওয়াকে সম্মানজনক দাবি করছে।
১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতায় তৈরি হওয়া জট বর্তমানে দেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। চমৎকার শুরুর পর শেষ মুহূর্তে এসে এই প্রক্রিয়ায় কেন স্থবিরতা তৈরি হলো জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ বলেন, আমাদের “এ” গ্রেডের আসন রয়েছে ১৪০টি। আসন সংখ্যা ১০০ বা এর কাছাকাছি হলে আমরা সেটিকে সম্মানজনক বলে মনে করি। কিন্তু জামায়াত সেখানে অনেক কম আসন দিতে চাইছে, তারা সংখ্যাটি ৪০ থেকে ৫০-এর মধ্যে রাখতে চায়।
জামায়াতের এক শীর্ষস্থানীয় নেতা জানান, কিছু আসনে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শক্তিশালী প্রার্থী রয়েছে। শেষ পর্যন্ত জনপ্রিয়তা ও যোগ্যতা যাচাই করে ইসলামী আন্দোলনকে আরও কয়েকটি আসনে ছাড় দিতে পারে জামায়াত। এই আলোচনাটি মূলত ‘ভোট, জোট ও জয়ের’ সমীকরণের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ উপলক্ষে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি পুনর্গঠন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এই কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম। দলীয় নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণসহ ১১ দলীয় আসন সমঝোতা জোটের অন্যতম সমন্বয়ক (কো-অর্ডিনেটর) হিসেবেও কাজ করছেন তিনি।
আসন সমঝোতার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ‘আসন সমঝোতার প্রাথমিক সদি”ছার ভিত্তিতে বৈঠক হয়েছে এবং প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। জোটভুক্ত দলগুলো আসন ভাগাভাগির যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেখানে সংখ্যার চেয়ে দলের জনপ্রিয়তা ও আসনভিত্তিক শক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ভিত্তিতে আসন সমঝোতা এখন চূড়ান্তের পথে।
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রসঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত একই মঞ্চে, একই ইশতেহার এবং একই সেøাগান নিয়ে জাতির সামনে হাজির হওয়া না যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটিকে পূর্ণাঙ্গ জোট বলা যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত বিষয়টিকে একটি নির্বাচনী সমঝোতা হিসেবেই নিতে হবে। আসন সমঝোতার আলোচনায় চমক হিসেবেই জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে শরিক হয় এনসিপি। দলটির নেতাদের দাবি অনুযায়ী, সমঝোতার শুরুতে ৩০টি আসনে ছাড় দেওয়ার আশ্বাস পেয়েছিলেন তারা। তবে পরবর্তী সময়ে জোটের অন্দরে আসন সংখ্যা কিছুটা কমতে পারে বলে গুঞ্জন শোনা যায়। যদিও জামায়াত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এনসিপিকে শেষ পর্যন্ত ৩০টি আসনে ছাড় দেওয়া হতে পারে।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গত ১০ জানুয়ারি শনিবার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, জোটে তারা কতটি আসন পাচ্ছেন, তা আগামী দু-এক দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।




Comments