বাঞ্ছারামপুরে চতুর্মুখী লড়াইয়ে ইতিহাসের বাঁকবদলের আভাস
১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (বাঞ্ছারামপুর) আসনে নির্বাচনী লড়াই মানেই ছিল বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ‘নৌকা’ বনাম ‘ধানের শীষের’ দ্বৈরথ। তবে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পাল্টে গেছে দীর্ঘ তিন দশকের সেই চিরচেনা সমীকরণ। বড় দুই দলের দলীয় প্রতীকের অনুপস্থিতিতে এবার বাঞ্ছারামপুরে সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। ব্যক্তিগত ইমেজ, স্থানীয় আবেগ আর আগামীর ক্ষমতার সমীকরণকে কেন্দ্র করে এখানে এখন চতুর্মুখী লড়াইয়ের উত্তাপ ছড়িয়েছে।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ‘মাথাল’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। শুরুতে স্থানীয় বিএনপির বড় অংশের সাথে কিছুটা দূরত্ব থাকলেও বর্তমানে তা কেটে গেছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে সাকির ঘনিষ্ঠতা এবং জোট ক্ষমতায় গেলে তার ‘মন্ত্রী’ হওয়ার গুঞ্জন এখন বাঞ্ছারামপুরের মানুষের মুখে মুখে। এই সম্ভাবনা সাধারণ ভোটার ও বিএনপি কর্মীদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি করেছে। সাকির ব্যক্তিগত গণসংযোগ ও সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার প্রবণতা তাকে জনপ্রিয়তার দৌড়ে এগিয়ে রাখছে।
বাঞ্ছারামপুরে নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ মহসিন। আইনি জটিলতায় পূর্ব নির্ধারিত প্রার্থী সরে দাঁড়ালে শেষ মুহূর্তে তিনি মনোনীত হন। জামায়াতের একনিষ্ঠ ও সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনী তার মূল শক্তি। বড় দলের প্রতীক না থাকায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে যে অনীহা তৈরি হয়েছে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে ভোটারদের কেন্দ্রে আনার সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা নিয়েছে জামায়াত। ফলে যেকোনো সময় ফলাফলে বড় অঘটন ঘটিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন তিনি।
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইদুজ্জামান কামাল ‘হরিণ’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। তার মূল শক্তি হলো ব্যক্তিগত সাহসিকতা ও জনপ্রিয়। বিশেষ করে ২০২২ সালে পুলিশের গুলিতে নিহত ছাত্রদল নেতা নয়ন মিয়ার স্মৃতিবিজড়িত সোনারামপুর ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় তার বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে। যারা সরাসরি দলীয় আনুগত্যের চেয়ে রাজপথের ত্যাগ ও ব্যক্তিগত লড়াইকে প্রাধান্য দেন, তাদের প্রথম পছন্দ কামাল।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী সাইদউদ্দিন খাঁন জাবেদ লড়ছেন ‘হাতপাখা’ প্রতীক নিয়ে। তিনি একজন সাবেক সংসদ সদস্যের ভাতিজা হওয়ায় তার রয়েছে পারিবারিক ঐতিহ্যের ভোট। বিশেষ করে নিজ ইউনিয়ন দরিকান্দিতে তার অবস্থান অত্যন্ত মজবুত। পাশাপাশি সারা উপজেলা জুড়ে থাকা চরমোনাই পীরের অনুসারী ও সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনী তাকে লড়াইয়ে টিকিয়ে রেখেছে।
বাঞ্ছারামপুরের এবারের নির্বাচন প্রথাগত জোটের চেয়েও ব্যক্তি ইমেজ ও আগামীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ‘ভবিষ্যৎ মন্ত্রী’ হওয়ার হাতছানি, অন্যদিকে রাজপথের রক্তের ঋণ আর ধর্মীয় মূল্যবোধের ভোট—সব মিলিয়ে বাঞ্ছারামপুরের ভোটাররা এবার কোন দিকে রায় দেন, তা দেখার অপেক্ষায় পুরো জেলাবাসী।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments