দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার মাত্র সাত সপ্তাহের মাথায় জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছেন তারেক রহমান। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতনের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি দুই শতাধিক আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পথে রয়েছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘টাইম’ তারেক রহমানের একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে, যেখানে তিনি আগামীর বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা ও তাঁর অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরেছেন।
টাইমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারেক রহমানের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষিণ এশিয়ার এই দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে পুনর্গঠন এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন দূর করা। সাক্ষাৎকারে উঠে আসা পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা ও প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান:
হাসিনা সরকারের আমলে দেড় দশকে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষকে গুম করা এবং জুলাই অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যুর ক্ষত এখনো তাজা। তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন। তিনি বলেন, “প্রতিশোধ কিছুই ফিরিয়ে আনতে পারবে না। বরং আমরা যদি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারি, তবেই ভালো কিছু অর্জন সম্ভব।” শেখ হাসিনার আমলে ধ্বংস হওয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে তাঁর প্রথম কাজ।
২. অর্থনৈতিক সংস্কার ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি:
দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং ক্রমহ্রাসমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মোকাবিলা করা তাঁর সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তারেক রহমান ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এর মাধ্যমে নারী ও বেকারদের মাসিক নগদ সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। এ ছাড়া তাঁর পরিকল্পনায় রয়েছে:
ডিজিটাল অর্থনীতি: তরুণ উদ্যোক্তাদের বিশ্ববাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া।
ব্যাংকিং খাত: এই খাতকে আন্তর্জাতিক মানের ও উদারীকরণ করা।
প্রবাসী শ্রমিক: ১০ লাখ প্রবাসীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও ভাষা শিক্ষা নিশ্চিত করা, যাতে তাঁরা উচ্চ বেতনের চাকরি পেতে পারেন।
৩. ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক:
তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ‘সবার আগে বাংলাদেশের স্বার্থ’ অগ্রাধিকার পাবে।
ভারত: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতোমধ্যে তারেক রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে তারেক রহমান টাইমের কাছে মন্তব্য করেছেন যে, হাসিনার আমলে ভারতের সাথে হওয়া অনেক ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক চান, তবে তা হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে।
যুক্তরাষ্ট্র: ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত ৩৭ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চান তিনি। এর বিনিময়ে মার্কিন পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা হবে।
৪. ইসলামপন্থী ও রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য:
নির্বাচনে বিএনপির পর দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তারেক রহমান মনে করেন, গণতন্ত্রে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। তিনি বলেন, “এটি শুধু বিএনপির দায়িত্ব নয়, বরং সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব যাতে দেশ আবার ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে না যায়।” নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় বিএনপিকে জোট সরকার গঠন করতে হবে না, তবে জাতীয় স্বার্থে সব দলের অংশগ্রহণে তিনি বিশ্বাসী।
৫. শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষা ও জুলাই বিপ্লবের মর্যাদা:
জুলাই অভ্যুত্থানের কারিগর শিক্ষার্থীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, “যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমাদের বিশাল দায়িত্ব রয়েছে।” শিক্ষার্থী নেতাদের গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) রাজনৈতিক মাঠে আসলেও তারেক রহমান মনে করেন, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা করাই হবে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের প্রকৃত সম্মান।
তারেক রহমান টাইমের কাছে তাঁর অগ্রাধিকার হিসেবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রীর মসনদে বসতে যাচ্ছেন, তখন বিশ্ববাসীর নজর এখন তাঁর ‘ঐক্যের রাজনীতি’র দিকে।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments