ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, পানি থাকা সত্ত্বেও তায়াম্মুম করা যাবে কি না, তা নির্ভর করে পরিস্থিতির ওপর। কেবল সামান্য শীত বা অলসতা করে তায়াম্মুম করা জায়েজ নয়। তবে নিচের বিশেষ পরিস্থিতিতে শীতে তায়াম্মুম করা যাবে:
অসুস্থ হওয়ার প্রবল আশঙ্কা: যদি পানি ব্যবহার করলে নিশ্চিতভাবে অসুস্থ হওয়ার ভয় থাকে অথবা বর্তমান রোগ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তায়াম্মুম করা যাবে।
পানি গরম করার ব্যবস্থা না থাকা: যদি পানি এতটাই ঠান্ডা হয় যে তা ব্যবহার করলে শরীরের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং সেই পানি গরম করার মতো কোনো মাধ্যম (চুলা, হিটার বা আগুন) না থাকে, তবে তায়াম্মুম করা জায়েজ।
তীব্র শৈত্যপ্রবাহ: যদি শীতের তীব্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে গোসল করলে মৃত্যু বা অঙ্গহানির আশঙ্কা থাকে, তবে তায়াম্মুম করা যাবে।
হাদিসের প্রমাণ
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগেও এমন ঘটনা ঘটেছিল। আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— ‘ধাতুস সালাসিল’ যুদ্ধের সময় এক অত্যন্ত ঠান্ডা রাতে আমার স্বপ্নদোষ হয়। আমার আশঙ্কা হলো যে যদি আমি গোসল করি তবে আমি মারা যাব। তাই আমি তায়াম্মুম করলাম এবং আমার সাথীদের নিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করলাম। বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পৌঁছালে তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আমর! তুমি অপবিত্র থাকা সত্ত্বেও সাথীদের নিয়ে নামাজ পড়লে?’ আমি জানালাম— মহান আল্লাহর বাণী ‘তোমরা নিজেদের হত্যা করো না, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ওপর অত্যন্ত দয়ালু’ (সূরা নিসা, আয়াত: ২৯) মনে করে আমি তায়াম্মুম করেছি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) মুচকি হাসলেন এবং কিছুই বললেন না। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৩৪)। রাসূল (সা.)-এর এই নীরবতা তায়াম্মুমের বৈধতার প্রমাণ।
তায়াম্মুমের সঠিক নিয়ম
তায়াম্মুম করার জন্য পবিত্র মাটি বা মাটিজাতীয় বস্তু (যেমন— ধুলোবালি, পাথর, সিমেন্ট, ইটের দেয়াল) প্রয়োজন। তায়াম্মুমের প্রধান কাজ তিনটি:
নিয়ত করা: মনে মনে এই সংকল্প করা যে, আমি পবিত্রতা অর্জনের জন্য তায়াম্মুম করছি।
মুখমণ্ডল মাসেহ করা: বিসমিল্লাহ বলে দুই হাত পবিত্র মাটিতে আঘাত করে বা হাত রেখে পুরো মুখমণ্ডল একবার মাসেহ করা।
হাত মাসেহ করা: পুনরায় মাটিতে হাত মেরে উভয় হাত কনুইসহ (মতান্তরে কবজি পর্যন্ত) একবার মাসেহ করা। প্রথমে ডান হাত এবং পরে বাম হাত মাসেহ করতে হয়।
তায়াম্মুমের সময় জরুরি সতর্কতা
-
অলসতা নয়: পানি গরম করার সুযোগ থাকলে বা ঠান্ডা সহ্য করার মতো শারীরিক ক্ষমতা থাকলে সামান্য ঠান্ডার অজুহাতে তায়াম্মুম করা যাবে না।
-
পানি গরম করা: আধুনিক যুগে গিজার বা চুলার মাধ্যমে পানি গরম করা খুব সহজ। যদি এমন সুযোগ থাকে, তবে অবশ্যই পানি গরম করে অযু বা গোসল করতে হবে।
-
অক্ষমতা দূর হলে তায়াম্মুম বাতিল: তায়াম্মুম করার পর যদি পানি ব্যবহার করার ক্ষমতা ফিরে আসে অথবা পানি গরম করার ব্যবস্থা হয়, তবে তায়াম্মুম ভেঙে যাবে এবং অযু বা গোসল করতে হবে।
পরিশেষে, ইসলাম মানুষের কষ্ট দূর করতে চায়। শরিয়ত ওজরগ্রস্ত ব্যক্তিকে তায়াম্মুমের অনুমতি দিয়েছে ঠিকই, তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন এটি অভ্যাসে পরিণত না হয়। সুস্থ ও সক্ষম ব্যক্তির জন্য কষ্টের বিনিময়ে অযু করার মধ্যেও রয়েছে বিশাল সওয়াব। কিন্তু যেখানে জীবনের ঝুঁকি বা মারাত্মক অসুস্থতার ভয় আছে, সেখানে জেদ না করে তায়াম্মুমের মতো আল্লাহর দেওয়া সহজ সুযোগ গ্রহণ করাই ইসলামের শিক্ষা।
Comments