আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড শুল্ক হুমকি: ইউরোপের পাল্টা আঘাতের ‘বাজুকা’ অপশনটি কী?
গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাবে বাধা দেওয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর জবাবে ইউরোপ এখন তাদের অর্থনৈতিক প্রতিরোধের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র— "ট্রেড বাজুকা" ব্যবহারের কথা ভাবছে।
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর দাবি, ট্রাম্প তাকে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন যেখানে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না দেওয়াটা এই কঠোর অবস্থানের অন্যতম কারণ। ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি এবং ইউরোপের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো।
নরওয়েকে লেখা ট্রাম্পের চিঠিতে কী ছিল?
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরের কার্যালয় নিশ্চিত করেছে যে, তিনি ট্রাম্পের কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়েছেন। সেখানে ট্রাম্প লিখেছেন: "৮টিরও বেশি যুদ্ধ থামানোর পরেও আপনাদের দেশ আমাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই এখন থেকে শুধু শান্তির কথা ভাবতে আমি আর বাধ্য নই।"
ট্রাম্প আরও যোগ করেন, "যদিও শান্তিই সর্বদা প্রাধান্য পাবে, তবে এখন আমি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যা ভালো এবং সঠিক তা নিয়ে ভাবতে পারি।" ট্রাম্পের মতে, ডেনমার্ক রাশিয়া বা চীনের হাত থেকে গ্রিনল্যান্ডকে নিরাপদ রাখতে পারবে না। তিনি লিখেন, "গ্রিনল্যান্ডের ওপর আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বিশ্ব নিরাপদ নয়।"
ইউরোপের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের শুল্ক পরিকল্পনা
গত ১৭ জানুয়ারি নিজের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প লেখেন যে, তিনি ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশগুলোকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে এতদিন ভর্তুকি দিয়ে এসেছেন।
তিনি ঘোষণা করেন, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস এবং ফিনল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। ১ জুন থেকে এই শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে। ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, "গ্রিনল্যান্ড সম্পূর্ণভাবে কেনার চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই শুল্ক কার্যকর থাকবে।"
উল্লেখ্য, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতারা বারবার বলেছেন যে গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়। দ্বীপটির বাসিন্দারাও ট্রাম্পের এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র কেন গ্রিনল্যান্ড কিনতে চায়?
গ্রিনল্যান্ডের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। ১৮৬৭ সালে আলাস্কা কেনার পর তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম সেওয়ার্ড এটি কেনার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৪৬ সালে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান গোপনভাবে ডেনমার্ককে ১০০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দেন, যা পরে প্রকাশ পায়।
ভৌগোলিক ও সামরিক দিক থেকে গ্রিনল্যান্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যে এটি সংক্ষিপ্ততম বিমান ও সমুদ্র পথ সরবরাহ করে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্কটিক অঞ্চলে নতুন শিপিং রুট তৈরি হওয়া এবং সেখানে প্রচুর পরিমাণে ‘রেয়ার-আর্থ’ খনিজ (স্মার্টফোন ও যুদ্ধবিমান তৈরিতে ব্যবহৃত) থাকায় এই দ্বীপের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে।
ইউরোপের প্রতিক্রিয়া
ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি পাল্টা ব্যবস্থা না নিয়ে আপাতত কূটনৈতিক উপায়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছে। ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র ওলফ গিল বলেন, "আমাদের অগ্রাধিকার হলো আলোচনা করা, উত্তেজনা বাড়ানো নয়। তবে প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সব সরঞ্জাম আমাদের হাতে আছে।"
রোববার ইইউ’র ২৭টি দেশ এক জরুরি বৈঠকে বসে। ট্রাম্পের লক্ষ্যবস্তু হওয়া আটটি দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, তারা ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মানুষের পাশে আছে এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা ঐক্যবদ্ধ।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ কেবল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মানুষই নির্ধারণ করবে। তিনি শুল্ক যুদ্ধকে কারো জন্য মঙ্গলজনক নয় বলে উল্লেখ করেন। তবে নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ভ্যান উইয়েল ট্রাম্পের এই আচরণকে "ব্ল্যাকমেইল" বলে অভিহিত করেছেন।
‘ট্রেড বাজুকা’ বা এসিআই কী?
"ট্রেড বাজুকা" হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি আইনি ব্যবস্থা যা ২০২৩ সালে গৃহীত হয়। এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট’ (ACI)। এটি মূলত ইইউভুক্ত দেশগুলোকে বাইরের কোনো দেশের অর্থনৈতিক চাপ বা জবরদস্তি থেকে রক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
ইকোনমিক্স প্রফেসর জো মিশেল আল-জাজিরাকে বলেন, "এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অস্ত্র। এর মাধ্যমে মার্কিন পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ, ইইউ বাজারে মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার সীমিত করা এবং সরকারি চুক্তিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব।"
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ইউরোপে ব্যবসা করা কঠিন করে দেওয়ার ক্ষমতাও এই আইনের মাধ্যমে ইইউর হাতে রয়েছে।
এই ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর হবে?
এটি একটি শেষ ধাপের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এটি কার্যকর করতে প্রথমে তদন্ত করতে হয় যে সত্যিই কোনো অর্থনৈতিক জবরদস্তি ঘটছে কি না। এরপর কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। যদি তা ব্যর্থ হয়, তবে ইইউর ২৭টি দেশের মধ্যে অন্তত ১৫টি দেশের (যারা ব্লকের ৬৫% জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে) সমর্থন নিয়ে এটি কার্যকর করা যায়। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এর প্রভাব কী হতে পারে?
পণ্য বা গুডস আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ঘাটতি থাকলেও আইটি সেবা, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ এবং আর্থিক সেবায় যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের চেয়ে এগিয়ে। ইউরোপ যদি পণ্যের বদলে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ‘সার্ভিস সেক্টর’ বা সেবা খাতের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে, তবে তা মার্কিন অর্থনীতির জন্য বড় আঘাত হবে। বিশেষ করে বড় টেক কোম্পানিগুলোর শেয়ার বাজারে বড় ধস নামতে পারে। তবে এতে ইউরোপীয় গ্রাহকদেরও উচ্চমূল্য বা সেবা সীমিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ইউরোপ কী করবে?
শোনা যাচ্ছে, ইউরোপ প্রাথমিক প্রতিরক্ষা হিসেবে মার্কিন পণ্যের ওপর ৯৩ বিলিয়ন ইউরো বা ১০৮ বিলিয়ন ডলারের শুল্ক আরোপের কথা ভাবছে। অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, ‘বাজুকা’ ব্যবহারের বদলে শেষ পর্যন্ত একটি মধ্যস্থতা হতে পারে— যেখানে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ডেনমার্কের কাছেই থাকবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেখানে বিশেষ খনিজ অধিকার বা বর্ধিত সামরিক উপস্থিতির সুবিধা পাবে। তবে আপাতত ইউরোপ তাদের ‘বাজুকা’ প্রস্তুত রেখেই আলোচনার টেবিলে বসতে চাইছে।




Comments