Image description

ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের অসম যুদ্ধের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালি সামুদ্রিক যান চলাচলের জন্য বন্ধ থাকায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সরকার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে।

পারস্য উপসাগর থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ফিলিপাইনে সরকারি অফিসগুলো সপ্তাহে চার কর্মদিবসের নীতি গ্রহণ করেছে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের কর্মকর্তাদের হোম অফিস তথা বাড়ি থেকে কাজ করতে এবং ভ্রমণ সীমিত করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। যা ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় ঘটেছিল, দেশে দেশে ভ্রমণ সীমিত করাসহ হোম অফিস চালু করেছিল অনেক সরকার ও বহু প্রতিষ্ঠান।

অন্যদিকে, মিয়ানমার সরকার গাড়ি চলাচলের জন্য 'অল্টারনেটিং ড্রাইভিং ডেস' (এক দিন অন্তর গাড়ি চালানো) নীতি চালু করেছে।

জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকারগুলো সরাসরি বাজারেও হস্তক্ষেপ করছে। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল ডিজেলের ওপর সাময়িক মূল্যসীমা নির্ধারণের ঘোষণা দিয়েছেন। 

সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক ‘এশিয়া ডিকোডেড’ এর পরিচালক ও প্রধান অর্থনীতিবিদ প্রিয়াঙ্কা কিশোরের মতে, হরমুজ প্রণালি যদি বন্ধ থাকে, তবে এ অঞ্চলে আরও বড় ধরনের কী ঘটতে চলেছে-এসব পদক্ষেপ তার একটি আগাম মহড়া মাত্র। প্রিয়াঙ্কা কিশোর বলেন, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা তাদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই তারা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।

নিজস্ব খনিজ জ্বালানির উল্লেখযোগ্য মজুদ থাকা সত্ত্বেও, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আমদানিকৃত তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যার একটি বড় অংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়া অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৪ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৮৩ শতাংশেরই গন্তব্য ছিল এশিয়া।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মোট তেল চালানের প্রায় ৭০ শতাংশ গ্রহণ করে এবং অবশিষ্ট এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বরাদ্দ থাকে প্রায় ১৫ শতাংশ।

জাকার্তা-ভিত্তিক ‘ইকোনমিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর আসিয়ান অ্যান্ড ইস্ট এশিয়া’ (ইআরআইএ)-এর অর্থনীতিবিদ অ্যালয়সিয়াস জোকো পুরওয়ান্তোর মতে, অপরিশোধিত তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ব্রুনাইয়ের অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সরবরাহ শৃঙ্খলের এই ধাক্কা এই অঞ্চলের সীমিত জ্বালানি মজুদের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা নৌপথটি বন্ধ থাকার প্রতিটি দিন আরও বেশি চাপের মুখে পড়ছে।

ভিয়েতনাম মধ্যপ্রাচ্য বহির্ভূত দেশগুলো থেকে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সংগ্রহের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ‘ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস’-এর গবেষক স্যাম রেনল্ডস বলেছেন, এটি দেশটির মাত্র ছয় দিনের ব্যবহারের সমান। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী ভিয়েতনামের কাছে ২০ দিনের মজুদ রয়েছে; সেই তথ্যের ভিত্তিতে রেনল্ডস বলেন, নতুন করে তেল সরবরাহ না হলে দেশটি জ্বালানি সংকটের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি ইন্দোনেশিয়ার কাছে প্রায় ২১-২৩ দিনের জ্বালানি মজুদ রয়েছে। থাইল্যান্ডের জ্বালানি মন্ত্রী আত্তাপোল রের্কপিবুন গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, দেশটির কাছে ৬৫ দিনের মজুদ আছে এবং সরকার আরও ৩০ দিনের অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে।

ফিলিপাইনের কাছে ৫০-৬০ দিনের মজুদ থাকলেও সেগুলো বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন। রেনল্ডস জানান, এর ফলে ম্যানিলাকে এখন ‘পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর আবগারি শুল্ক কমানো, ফিলিপাইন ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির মাধ্যমে অতিরিক্ত আমদানি এবং মজুদ ছাড়ার জন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছে বিশেষ অনুরোধের’ ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

রেনল্ডস বলেন, সব দেশই ব্যাহত হওয়া সরবরাহ ব্যবস্থার বিকল্প খুঁজতে মরিয়া। তবে রিফাইনারি বা শোধনাগারগুলোর বিশেষ কাঠামো, ভিন্ন মানের অপরিশোধিত তেল ব্যবহারের ঝুঁকি, শিপিং দূরত্ব এবং অতিরিক্ত খরচের কারণে স্বল্পমেয়াদী বিকল্পগুলো বেশ সীমিত।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর এই জরুরি মজুদ উত্তর-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় খুবই সামান্য। জাপানের কাছে ২৫৪ দিনের মজুদ রয়েছে, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের কাছে যথাক্রমে ২০৮ ও ১২০ দিনের মজুদ আছে।

হ্রাস পাওয়া অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ প্রতিস্থাপন করা এই চ্যালেঞ্জের একটি অংশ মাত্র। দেশগুলোকে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মাধ্যমে পাওয়া পেট্রোলিয়াম পণ্য-যেমন গ্যাসোলিন, ডিজেল, জেট ফুয়েল এবং পেট্রোকেমিক্যালস-এর ঘাটতিও পূরণ করতে হবে।

ইআরআইএ জোকো জানিয়েছেন, লাওস, কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারের তেল শোধনাগার নেই বললেই চলে অথবা অত্যন্ত সীমিত সক্ষমতা সম্পন্ন; যার ফলে তাদের প্রতিবেশী থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুর থেকে রপ্তানি করা পণ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। 

তিনি বলেন, এশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোর গতি কমে যাওয়ায় এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ঠিক রাখতে পেট্রোলিয়াম রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করায় এই দেশগুলো বাড়তি চাপের মুখে পড়বে।

থাইল্যান্ড ইতোমধ্যেই কম্বোডিয়া এবং লাওস ব্যতীত অন্যান্য দেশে তেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ নিয়েছে। আঞ্চলিক বড় সরবরাহকারী দেশ চীনও তাদের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোকে জ্বালানি রপ্তানি স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে।

সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটার কারণে সিঙ্গাপুরের 'অ্যাস্টার কেমিক্যালস অ্যান্ড এনার্জি' এবং ইন্দোনেশিয়ার 'পিটি চন্দ্র আসরি প্যাসিফিক'-সহ বিভিন্ন পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি 'ফোর্স ম্যাজিউর' বা অনিবার্য পরিস্থিতির ঘোষণা দিতে শুরু করেছে; যার অর্থ হলো তারা তাদের চুক্তিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে সক্ষম নাও হতে পারে।

গত মঙ্গলবার সিয়াম সিমেন্ট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান থাই পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি 'রায়ং ওলেফিনস' জানিয়েছে যে, তারা তাদের কারখানার কার্যক্রম স্থগিত করছে। কারণ, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তারা ন্যাপথা এবং প্রোপেনের মতো মূল কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারছে না।

যদি এই অচলাবস্থা বজায় থাকে, তবে এই অঞ্চলে তেলের দাম আরও বৃদ্ধি এবং তেল ও গ্যাস ব্যবহারের ওপর আরও বেশি বিধিনিষেধ আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।