যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চললেও বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালি’কে নিজের দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান। মুখে এই কৌশলগত জলপথটি ‘বন্ধ’ ঘোষণা করলেও এক চতুর ও সুদূরপ্রসারী কৌশলে নিজের তেল রপ্তানি বাণিজ্য সচল রেখেছে তেহরান। গত ১৫ দিনে এই উত্তাল সমুদ্রপথ দিয়ে প্রায় ৯০টি জাহাজ চলাচল করেছে, যার সিংহভাগই ইরানের নিজস্ব অথবা তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশগুলোর।
মেরিন ডেটা ফার্ম ‘লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স’ এবং বাণিজ্য বিশ্লেষক সংস্থা ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১৫ মার্চের মধ্যে কমপক্ষে ৮৯টি জাহাজ এই বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়েছে। যার মধ্যে ছিল ১৬টি বিশাল তেলের ট্যাঙ্কার। অথচ এই পুরো সময়টাতে পশ্চিমা দেশগুলো দাবি করে আসছিল যে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি অবরুদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান তাদের উপকূলের খুব কাছ দিয়ে একটি ‘নিরাপদ করিডোর’ তৈরি করেছে, যার ওপর মার্কিন বা ইসরায়েলি রাডারগুলোর নজরদারি চালানো কঠিন।
কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের এই দামামার মধ্যেই চলতি মাসে এ পর্যন্ত ইরান ১৬ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল বিদেশে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। কড়া নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও চীন এখন ইরানি তেলের প্রধান গন্তব্য। লয়েডস লিস্ট জানাচ্ছে, অনেক জাহাজ ‘ডার্ক ট্রানজিট’ বা রাডার ফাঁকি দিয়ে এবং অবস্থান গোপন রেখে নিঃশব্দে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে।
তদন্তে দেখা গেছে, ইরান এই পথটি বেছে বেছে ব্যবহার করতে দিচ্ছে। নিবিড় কূটনৈতিক আলোচনার পর পাকিস্তান ন্যাশনাল শিপিং করপোরেশনের ‘করাচি’ নামক ট্যাঙ্কার এবং ভারতের ‘শিভালিক’ ও ‘নন্দা দেবী’ নামক দুটি জাহাজকে নিরাপদে এই প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে তেহরান। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই এই যাত্রা সম্ভব হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইরানি হামলা থেকে বাঁচতে অনেক বিদেশি জাহাজ এখন নিজেদের গায়ে ‘চীনা সংশ্লিষ্ট’ বা ‘সম্পূর্ণ চীনা ক্রু দ্বারা পরিচালিত’ লেবেল সেঁটে দিচ্ছে। ইরানের সঙ্গে বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে তারা সমুদ্রপথে বিমা সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই অভিনব পথ বেছে নিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে মিত্রদের ওপর সামরিক চাপ দিলেও খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ইরানি জাহাজ চলাচলে কিছুটা চোখ বুজে আছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ ঠিক রাখতে তারা ইরানি জাহাজগুলোকে কিছুটা নমনীয়তা দেখাচ্ছেন।
বর্তমানে ইরান হুমকি দিয়ে রেখেছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের অংশীদারদের জন্য ‘এক লিটার তেলও’ এই পথ দিয়ে যেতে দেওয়া হবে না। সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি এখন ইরানের হাতে এমন এক অস্ত্র, যা দিয়ে তারা একই সাথে যুদ্ধক্ষেত্র এবং বিশ্ববাজার—দুই জায়গাতেই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে।
মানবকণ্ঠ/আরআই




Comments