Image description

ঈদুল ফিতরের ছুটির সাত দিনে সরকারি হিসাবে সড়কে ৯২ দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত এবং ২১৭ জন আহত হয়েছেন। তবে বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রাথমিক হিসাবে একই সময়ে ২৬৮ সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৪ জন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা ছয় শতাধিক। মন্ত্রীরা স্মরণকালের নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রার দাবি করলেও, প্রাণহানির এই সংখ্যা অতীতের যে কোনো ঈদের ছুটির তুলনায় বেশি।

সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, দুর্ঘটনা ও হতাহতের অনেক তথ্য নেই। যেমন ২১ মার্চ রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং বাস দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত হওয়ার তথ্য নেই। হাসপাতালগুলোতে ঈদের ছুটিতে দুর্ঘটনায় আহত রোগীর ঢল ছিল।

সরকারি হিসাবে সারাদেশে আহতের সংখ্যা ২১৭ জন বলা হলেও, পঙ্গু হাসপাতাল নামে পরিচিত রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে ঈদের আগের রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে পরের দিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত ১৫১ জন আহত রোগী আসেন। দেশের অন্যান্য হাসপাতালেও ছিল একই চিত্র। অধিকাংশ আহত রোগী ছিলেন মোটরসাইকেল, ব্যাটারির রিকশা কিংবা ইজিবাইক দুর্ঘটনায় আহত।

বেসরকারি সংস্থাগুলো সাধারণত ঈদের আগে সাত দিন, পরের সাত দিন এবং ঈদের দিনসহ মোট ১৫ দিনকে ঈদযাত্রা হিসেবে গণ্য করে। অতীতে দেখা গেছে, এই সময়ের মধ্যে নিহতের সংখ্যা ৩০০ থেকে ৪০০ থাকে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে গত বছরের ঈদুল ফিতরের আগে-পরে ১৫ দিনে সড়ক-মহাসড়কে ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত হন। আহত হন ৮২৬ জন। সংগঠনটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ঈদুল ফিতরের ১৫ দিনে ৩৭২ দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত হয়েছিলেন। যা ছিল এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এবার ঈদের ছুটি শুরু হয় ১৭ মার্চ। সাত দিনের ছুটি চলে ২৩ মার্চ পর্যন্ত। গতকাল মঙ্গলবার ২৪ মার্চ অফিস-আদালত খুলেছে। তবে অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কলকারখানায় এখনও চলছে ঈদের ছুটি। আগামী শনিবার থেকে খুলবে। এ হিসেবে ঈদযাত্রা এখনও চলছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ১৭ মার্চ দুপুর থেকে ২৪ মার্চ দুপুর পর্যন্ত সাত দিনে অন্তত ২৬৮ সড়ক দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ২০৪ জন নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা একবারেই প্রাথমিক। ঈদের ছুটির কারণে অফিস বন্ধ রয়েছে। অনেক তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরুর পর আরও অনেক তথ্য আসবে। তখন বলা যাবে, প্রাণহানির প্রকৃত সংখ্যা কত। তবে যে আভাস মিলছে, তাতে প্রাণহানির রেকর্ড হতে পারে এবারের ঈদযাত্রায়।

সরকারি হিসাবে ছুটির সাত দিনে ১০০ জন নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যাও প্রাথমিক। বিআরটিএর একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, ছুটির কারণে অনেক তথ্য পাওয়া যায়নি। সব তথ্য আসার পর তা সরকারি মাধ্যমে যাচাই করার পর প্রকৃত সংখ্যা পাওয়া যাবে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৭ মার্চ ১২ দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন। ১৮ মার্চ ১৮ দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ৬২ জন আহত হয়েছেন। ১৯ মার্চ ১১ দুর্ঘটনায় আটজন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন। ২০ মার্চ ছয় দুর্ঘটনায় আটজন নিহত এবং ৩৬ জন আহত হয়েছেন। ২১ মার্চ ১৭ দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন। ২২ মার্চ ১৯ দুর্ঘটনায় ৩২ জন নিহত এবং ৬০ জন আহত হয়েছেন। ২৩ মার্চ ৯ দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হয়েছেন। 

গত বছরের ঈদুল ফিতরে ছুটি ছিল ৯ দিন; ২৮ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত। সেবার সরকারি হিসাবে ১৪৬ জন নিহত হন। গড়ে দৈনিক ১৬ দশমিক ২২ জন প্রাণ হারান। এবার সাত দিনের ছুটিতে দিনে গড়ে ১৪ দশমিক ২৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। তবে সরকারি সূত্রগুলোই বলছে, পূর্ণাঙ্গ তথ্য আসার পর এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। 

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল চৌধুরী বলেছেন, সাধারণত ঈদের ছুটির পর কর্মস্থলে ফেরার পথে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বৃদ্ধি পায়। কারণ, ঈদের আগে সরকারের যে নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে কঠোরতা সড়কে থাকে, তা ঈদের পর দেখা যায় না। 

একই ভাষ্য জানিয়ে সাইদুর রহমান বলেছেন, এ কারণে প্রতিবছরই ঈদের পর কর্মস্থলে ফেরার পথে প্রাণহানি বৃদ্ধি পায়। এবারও এই ধারা অব্যাহত থাকলে এবং সরকার কঠোর না হলে নিশ্চিতভাবেই এবারের ঈদযাত্রায় প্রাণহানির রেকর্ড হবে। 

সাইদুর রহমান বলেন, ২৮ মার্চ পর্যন্ত পরিস্থিতি আরও পরিবর্তিত হতে পারে। এবার ট্রেনে দুর্ঘটনা অতীতের তুলনায় বেশি। জ্বালানি সংকটের কারণে মোটরসাইকেলের ব্যবহার না কমলে, দুর্ঘটনা আরও বৃদ্ধি পেত। অধিকাংশ দুর্ঘটনায় ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, অটোরিকশাসহ সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ যানবাহনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

সড়ক-মহাসড়কে দ্রুতগতির গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যাটারির রিকশা-অটোরিকশা চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে এ মতামত দিয়ে রিকশা নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পর রিকশা চলাচল আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যাটারিচালিত এই যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা কত, তা এখন আর কেউ জানে না। ধারণা করা হয়, অন্তত ১৫ লাখ ব্যাটারি রিকশা চলে সারাদেশে। কারও কারও দাবি, সংখ্যাটি ৪০ লাখ। অন্তর্বর্তী সরকার সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভা আইনে সংশোধন করে ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে নিবন্ধনের মাধ্যমে বৈধতার সুযোগ দিয়েছে। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেছেন, দ্রুতগতির যান চলাচলের উপযোগী সড়ক-মহাসড়কে একই সঙ্গে যতদিন ব্যাটারির রিকশা, ইজিবাইক, অটোরিকশা চলবে, ততদিন দুর্ঘটনা ঠেকানো যাবে না। এসব যানবাহনে সামান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। বাস, ট্রাকের মতো বড় যানবাহন ছাড়াও মাইক্রোবাস, পিকআপের মতো মাঝারি যানবাহনের সঙ্গে সাধারণ সংঘর্ষেও ভয়াবহ প্রাণহানি হচ্ছে। 

তথ্য অনুযায়ী, ঈদযাত্রায় মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, ব্যাটারি রিকশা-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় অধিকাংশ প্রাণহানি হয়েছে। ভেদরগঞ্জ (শরিয়তপুর) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, উপজেলায় ঈদের তিন দিনে পৃথক দুর্ঘটনায় অন্তত ৬০ জন আহত হয়েছেন। হাসপাতাল, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মোটরসাইকেল আরোহী ও চালকদের অধিকাংশ কিশোর। ড্রাইভিং লাইসেন্স ও হেলমেট ছাড়াই দাপিয়ে বেড়ায় তারা। গত সোমবার রাতে উপজেলার গাজীপুর ব্রিজে দুই বন্ধুসহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে অনিক হাওলাদার নামে এক ১৭ বছরের কিশোর। হেলমেট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না তার। ঈদের ছুটিতে রাস্তায় পুলিশ নেই তাই বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে বের হয়। 

ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার বেলায়াত রাজু বলেন, সোমবার এক দিনে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত ৩০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। 

মানবকণ্ঠ/ডিআর