Image description

“শাস্তি নয়, সুরক্ষা—ভালবাসা ও অধিকার খুঁজে ফেরা পথশিশুদের হৃদয়ছোঁয়া সংগ্রাম” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকায় যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক পথশিশু দিবস ২০২৬। কনসোর্টিয়াম ফর স্ট্রিট চিলড্রেন (সিএসসি)-এর বৈশ্বিক আহ্বানে সারা দিয়ে বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (লিডো) চার দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই দিবসটি উদযাপন করে।

রোববার (১২ এপ্রিল) দিবসের সমাপনী দিনে সকাল ১১টায় শাহবাগ থানা গেট থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি বের করা হয়। র‍্যালিটি টিএসসি মোড় প্রদক্ষিণ করে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে এসে শেষ হয়। এতে পথশিশু, সুবিধাবঞ্চিত বস্তিবাসী শিশুসহ প্রায় ৪০০ জন শিশু অংশগ্রহণ করে। শিশুদের সাথে সংহতি জানিয়ে র‍্যালিতে যোগ দেন বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী, সংগীতশিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং বিশিষ্ট সামাজিক ব্যক্তিবর্গ।

র‍্যালি পরবর্তী আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। লিডোর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রধান শিশু সুরক্ষা কর্মকর্তা মিস নাতালি ম্যাককলি, কেএফসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দেব থাপা, এইচআরডিসির নির্বাহী মো. মাহবুবুল হক, জনপ্রিয় অভিনেতা মুকিত জাকারিয়া, বিশিষ্ট অভিনেত্রী ও নির্দেশক ত্রপা মজুমদার। এছাড়া প্রকৌশলী আবুল বাশার, সমাজকর্মী শহিদুল ইসলাম, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কৃষান ভূঁইয়া এবং লিডোর বোর্ড সদস্য তুষার আহমেদ ইমরানসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে লিডোর সুবিধাভোগী শিশু হাসান মুসাফির। তার বক্তব্যে পথশিশুদের জীবনের রূঢ় বাস্তবতা, জন্মনিবন্ধন না থাকা, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তিতে বৈষম্য এবং আইনি জটিলতার বিষয়গুলো উঠে আসে। হাসান স্পষ্ট করে বলে, “আমরা কারও করুণা চাই না, নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রাপ্য অধিকারটুকু চাই।”

হাসান মুসাফিরের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে এ বি এম মোশাররফ হোসেন এমপি বলেন, “উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও পথশিশুরা এখনও প্রান্তিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। পারিবারিক ভাঙন ও চরম দারিদ্র্যের কারণে এই শিশুরা রাস্তায় বেড়ে উঠছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের। তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।” তিনি শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতীয় সংসদে তাদের দাবিগুলো তুলে ধরার আশ্বাস দেন এবং সরকার ও বিত্তবানদের একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে লিডোর ১০ জন সুবিধাভোগী শিশুকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়, যারা একসময় পথবাসী থাকলেও বর্তমানে নিজেদের চেষ্টায় সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছেন। এরপর লিডো পিস হোমের শিশুদের পরিবেশনায় এক মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রামাণ্যচিত্র “Where the Kids Have No Name” প্রদর্শিত হয়, যা উপস্থিত দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে।

উল্লেখ্য, এই চার দিনব্যাপী কর্মসূচিতে ঢাকা শহরের প্রায় ৫০০ পথশিশু সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলায় মেতে ওঠে। এর আগে ৮ এপ্রিল লিডোর ইয়ং চেঞ্জমেকারস টিম সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পথশিশুদের সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানায়।

সভাপতির বক্তব্যে ফরহাদ হোসেন বলেন, “পথশিশুদের টেকসই উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং সুরক্ষামূলক পরিবেশই পারে এই শিশুদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে।” তিনি অনুষ্ঠানটি সফল করতে সহযোগিতাকারী সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

মানবকণ্ঠ/ডিআর