এম এ কাইয়ুমের ভূমি লালসার শিকার বাড্ডা থানার সহস্রাধিক মানুষ
প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা ভুক্তভোগীদের
রাজধানীর বাড্ডা থানার সাঁতারকুল এলাকায় গেলে চোখে পড়ে বিশাল কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা কয়েক হাজার একর জমি। এই বেড়ার ভিতরে আটকে পড়েছে সাধারণ মানুষের সারাজীবনের সঞ্চয় ও স্বপ্ন। ভূমিদস্যুতার অত্যাচারে অসহায় হয়ে পড়েছেন শত শত পরিবার। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্বদেশ-সানভালী নামের রিয়েল এস্টেট কোম্পানি এই বিশাল এলাকা কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে ফেলেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ১৭ বছর স্বদেশ প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এম এ কাইয়ুম এবং আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াকিল উদ্দিনের গোপন আঁতাত ছিল এলাকার ত্রাসের মূল উৎস। দীর্ঘ এই সময় মালয়েশিয়ায় বসে কলকাঠি নেড়েছেন কাইয়ুম, আর মাঠ পর্যায়ে ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন ওয়াকিল উদ্দিন। এই দ্বৈত শক্তির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছেন তৃণমূল বিএনপির অসংখ্য নেতা-কর্মী; মামলা-হামলায় রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তারা। তবে ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সাথে সাথেই এই জুটির অবস্থানেও এসেছে অদ্ভুত এক ‘বদল’। স্থানীয়দের ভাষায় এটি যেন এক ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ খেলা। এতকাল যে কাইয়ুম প্রবাসে থেকে নিয়ন্ত্রণ করতেন, পটপরিবর্তনের পর তিনি দেশে ফিরে জমি দখল ও চাঁদাবাজির এক নতুন সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের ক্ষমতাধর সঙ্গী ওয়াকিল উদ্দিন এখন লোকচক্ষুর অন্তরালে পাড়ি জমিয়েছেন মালয়েশিয়ায়।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ক্ষমতার পালাবদলে একজন দেশ ছাড়লেও আরেকজন দেশে ফিরে এসে যেন পুরনো ত্রাসের রাজত্বকেই নতুন মোড়কে পুনর্জীবিত করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জোরপূর্বক জমি দখল আর চাঁদাবাজির মাধ্যমে নিজের আধিপত্য আরও পাকাপোক্ত করছেন ড. কাইয়ুম। এই ‘আদান-প্রদান’ আর কৌশলী রদবদল নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে এখন চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সাঁতারকুল এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক বিভীষিকাময় চিত্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাঁটাতারের বেষ্টনীতে ঘেরা এই বিশাল এলাকা আসলে স্বদেশ বা সানভ্যালীর নিজস্ব সম্পত্তি নয়; বরং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হাজারো সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জমি জবরদখল করে গড়ে তোলা হয়েছে এই তথাকথিত ‘প্রকল্প’। ভুক্তভোগীদের দাবি, নিজেদের পৈতৃক ভিটা বা কষ্টের টাকায় কেনা জমিতে পা রাখলেই জোটে বেধড়ক মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি। লক্ষ্য একটাই—মালিকদের ভয় দেখিয়ে পানির দামে জমি লিখে দিতে বাধ্য করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা হাবিবুর রহমানের ছেলে শহিদুল হকের চোখেমুখে এখন শুধু আতঙ্ক আর হতাশা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “বাবা ১৯৭৮ সালে অনেক কষ্টে লোনের টাকা দিয়ে আমার দুই বোনসহ আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে ৩ কাঠা জমি কিনেছিলেন। আজ সেই জমিতে গেলে আমাদের ওপর হামলা করা হয়। বিএনপি নেতা পরিচয়ে এম এ কাইয়ুম যে তাণ্ডব চালাচ্ছেন, আমরা তার বিচার চাই। আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ভূমিদস্যুর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।”
আরেক ভুক্তভোগী নাসিরুল ইসলাম বলেন, “বিএনপি নেতা এম এ কাইয়ুমের নির্দেশে আমার ৮ কাঠাসহ অসংখ্য দরিদ্র মানুষের জমি দখল করে রাখা হয়েছে। আমরা মানববন্ধনসহ প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছি। প্রয়োজনে আরও বড় আন্দোলনে যাব। কাইয়ুমের শাস্তি ও বিএনপি থেকে বহিষ্কার চাই।”
আনোয়ার হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী জানান, তাদের ১০ কাঠা জমি ইতিমধ্যে বালু ফেলে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। রাজিব হোসেন নামে এক জমির মালিক হুমকি-ধামকিতে বিরক্ত হয়ে কোনোমতে জমি বিক্রি করে দিতে চান।
প্রতিবাদী আন্দোলনে সক্রিয় ভুক্তভোগী খসরু বলেন, “ভূমি দখলকারী এম এ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চাইতে প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
নরসিংদীর বাসিন্দা ড. এম এ কাইয়ুম বাড্ডা এলাকায় লজিং মাস্টার হিসেবে জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াকিল উদ্দিনের সঙ্গে মিলে জমি দালালি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে আবাসন ব্যবসায় প্রবেশ করেন। ২০০৯ সাল থেকে খিলক্ষেত, বরুয়া, তলনা, ডেলনা, পাতিরা ও বাউতার এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে স্থানীয়দের জমি দখল করে ‘স্বদেশ প্রপার্টিজ’ নামে প্রকল্প গড়ে তোলেন। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, লুটপাট ও একাধিক হত্যার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সাল থেকেই সাঁতারকুলে ভূমি দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল বিএনপির এম এ কাইয়ুম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কিছু অংশের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সাতারকুল, বেরাইদ, ফকিরখালী পুরো এলাকা কাটা তারের বেড়া দিয়ে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের চলাচলের পথ বন্ধ করে দেয়। এছাড়া ড্রেজার পাইপের মাধ্যমে অন্যের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমিতে বালি ফেলে অবৈধভাবে ভরাট করার চেষ্টা চলাচ্ছে। প্রতিবাদ করলে সন্ত্রাসী হামলা, মিথ্যা মামলা দায়ের এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের শিকার হতে হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
মেজর (অব.) মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম এমপি হওয়ার পর কাইয়ুম স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা লাভ করেন এবং ঢাকা-১১, ১৭ ও ১৮ আসনে আধিপত্য বিস্তার করেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সম্পাদক এবং ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যদিও জয়লাভ করতে পারেননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৮-১০ বছর ধরে আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকে ম্যানেজ করে কাইয়ুম জোরপূর্বক ভূমি দখল চালিয়ে আসছিলেন। ৫ আগস্টের পর তা শতগুণ বেড়ে যায়। এলাকায় তার বিরুদ্ধে ব্যাপক জনরোষ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব সাম্প্রতিক নির্বাচনেও পড়েছে বলে মনে করেন অনেকে। ভুক্তভোগীরা দাবি করছেন— দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি, অবৈধভাবে দখল করা জমি ফিরিয়ে দেওয়া এবং এম এ কাইয়ুমকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার। তারা বলছেন, তাকে বহিষ্কার না করলে দল হিসেবে বিএনপির ওপরও জনরোষ পড়তে পারে।
এম এ কাইয়ুমের বক্তব্য জানতে তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হয়। কয়েকবার রিং হয়, কিন্তু তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।




Comments