Image description

দেশের স্বাস্থ্য খাতে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব মহামারি আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত মাত্র এক মাসে দেশে ১৯ হাজার ১৬১ জন শিশু হামে আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৮৯৭ জন। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এই স্বল্প সময়ে অন্তত ১৬৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামজনিত জটিলতায়, যার বড় একটি অংশই ৫ বছরের কম বয়সী।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই গণমৃত্যু কেবল একটি রোগতাত্ত্বিক সংকট নয়, বরং বিগত হাসিনা সরকার এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চরম নীতিগত ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির এক করুণ দলিল। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টি জেলাতেই এখন হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে, যা একটি ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়।

অব্যবস্থাপনার নেপথ্যে: অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, হামের এই প্রাণঘাতী বিস্তারের পেছনে একাধিক স্তরের অব্যবস্থাপনা দায়ী। বিগত সরকারের শেষ সময়  থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমল পর্যন্ত টিকা ব্যবস্থাপনায় যে ফাটল ধরেছিল, তার খেসারত দিচ্ছে আজকের শিশুরা। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি ভবনে অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরবর্তী প্রশাসনিক রদবদলের কারণে টিকাদান সূচিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন লাইন ডিরেক্টর বলেন, ‘আমরা স্বীকার করছি যে, ২০২৫ সালের শেষার্ধে টিকার সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। জেলা পর্যায়ের কোল্ড চেইন মেইনটেন্যান্স এবং মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের তদারকিতে যে চেইন অব কমান্ড ছিল, তা ভেঙে পড়েছিল। 

২০২৫ সালে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চলা স্বাস্থ্য খাতের সেক্টর প্রোগ্রাম কোনো বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই হঠাৎ বন্ধ করে দেয়া হয়। এর ফলে তৃণমূল পর্যায়ে টিকা পরিবহনের চেইন ভেঙে পড়ে। কোল্ড চেইন মেইনটেইন করে জেলা থেকে উপজেলা পর্যায়ে টিকা পাঠানোর কাঠামো তছনছ হয়ে যাওয়ায় টিকার গুণগত মানও নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও, ২০২৫ সালে একটি জাতীয় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও টাইফয়েড ক্যাম্পেইনের দোহাই দিয়ে তা বারবার পিছিয়ে দেয়া হয়।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভ্যাকসিন গ্যাপ বা টিকাদানের বিরতিই বর্তমান সংক্রমণের প্রধান কারণ। ২০২৫ সালে টিকার কভারেজ আশঙ্কাজনকভাবে ৫৭ শতাংশে নেমে আসে, যা আগের বছরগুলোতে ৯০ শতাংশের উপরে ছিল।

আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্বেগ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের এই হাম পরিস্থিতিকে বিপদজনক বলে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয়ের একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, হামের ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের জন্য ৯৫ শতাংশ কভারেজ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশে তা বর্তমানে ৮০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। রাজনৈতিক ডামাডোলে স্বাস্থ্য খাতের প্রযুক্তিগত সতর্কতাগুলো আমলে না নেয়ার ফলে আজ এই মহামারি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সংস্থাটির মতে, বর্তমানের এই ১০০-এর বেশি মৃত্যু কেবল সরকারি হিসাবের অংশ; প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে কারণ অনেক শিশু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুবরণ করছে।

রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল থেকে শুরু করে পাবনা জেনারেল হাসপাতাল কিংবা বরিশালের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স- সর্বত্রই একই চিত্র। শয্যার অভাবে অনেক শিশুকে হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ শিশুই কোনো ডোজ টিকা পায়নি, যা গত এক দশকের মধ্যে টিকার কভারেজে সর্বনিন্ম রেকর্ড।

চিকিৎসকদের হুঁশিয়ারি: হামের এই মহামারি পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় শিশু বিশেষজ্ঞরা গণমাধ্যমে তাদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ডাক্তার সজিৎ কুমার রায় বলেন, আমরা ক্লিনিক্যালি দেখছি, এবারের হামের প্রকোপ বিগত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। শিশুরা হাম, নিউমোনিয়া এবং এনসেফালাইটিসে (মস্তিষ্কের প্রদাহ) আক্রান্ত হয়ে দ্রুত মারা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ছেদ পড়া। টিকার কোল্ড চেইন যদি কয়েক ঘণ্টার জন্যও ব্যাহত হয়, তবে সেই টিকার কার্যকারিতা থাকে না। অনেক শিশু টিকা নিয়েও আক্রান্ত হচ্ছে, যা নির্দেশ করে যে সরবরাহকৃত টিকার মান রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এটি কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সংকট নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত অবহেলা যা শত শত শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।

দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কাঠামোগত ধস: হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে টিকা ও সিরিঞ্জ কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ইতোমধ্যে উচ্চ আদালতের আইনজীবীরা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করেছেন। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে যে, স্বাস্থ্য খাতে কয়েক হাজার কোটি টাকার বাজেট থাকা সত্ত্বে ও কেন সময়মতো জীবন রক্ষাকারী টিকা সংগ্রহ করা গেল না, তার পেছনে গভীর আর্থিক তছরুপ থাকতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ক্রয় প্রক্রিয়ায় আকস্মিক পরিবর্তন এবং স্বচ্ছতার অভাবকে এই প্রাণহানির জন্য সরাসরি দায়ী করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ তথ্য বিশ্লেষণ করলে টিকাদানের যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা অত্যন্ত হতাশাজনক। একদিকে বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাবে কেনাকাটায় বিলম্ব হয়েছে, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় টিকার এলসি খোলা স্থগিত ছিল। মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের দলীয় কর্মসূচিতে ব্যবহার এবং পরবর্তীকালে প্রশাসনিক শূন্যতায় কর্মবিরতির ফলে বাদ পড়া শিশুর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে।