Image description

উত্তরাঞ্চলের নদীভাঙন প্রবণ ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জনপদে প্রান্তিক নারীদের জীবন দীর্ঘদিন ধরেই সংগ্রাম মুখর। অর্থনৈতিক সুযোগের সীমাবদ্ধতা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং বাজারে প্রবেশের অপ্রতুলতা তাদের সম্ভাবনাকে আটকে রেখেছে। তবে সেই চিত্র এখন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। কারিগরি দক্ষতাকে ভিত্তি করে এসব নারী এখন হাঁটছেন আয়ের পথে, গড়ছেন স্বনির্ভরতার নতুন গল্প।

বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নিয়োজিত শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ঢাকা উইমেন্স চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহযোগিতায় এবং ফ্রান্স দূতাবাসের অর্থায়নে এমপাওয়ারিং উইথ স্কিলস, প্রমোটিং আর্টিসানাল ডাইভারসিটি, এনহ্যান্সিং লাইভলিহুড প্রকল্পটি গাইবান্ধায় বাস্তবায়ন করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অবলম্বন।

গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নারীরা একসময় শুধুই সংসারের কাজে সীমাবদ্ধ ছিলেন, তারা এখন পাট, সুতা কিংবা খামারভিত্তিক কাজে যুক্ত হয়ে আয় করছেন। কেউ ক্রোশেট পুতুল তৈরি করছেন, কেউ হ্যান্ডলুমে ফ্লোরম্যাট, ম্যাক্রামে পাটের ব্যাগ আবার কেউ হাঁস-মুরগি বা শূকর পালন করছেন।

প্রকল্পের আওতায় নারীদের ছয়টি মূল দক্ষতায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে- হ্যান্ডলুমে ফ্লোরম্যাট ও কার্পেট তৈরি, পাটের ব্যাগ ও ঝুড়ি, ম্যাক্রামে পণ্য, ক্রোশেট পুতুল, হাঁস-মুরগি পালন এবং শূকর পালন। প্রশিক্ষণের পর এখন তারা উৎপাদনমুখী কর্মকান্ডে যুক্ত হয়েছেন এবং স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করার পাশাপাশি বিদেশেও পাঠাচ্ছেন।

উপকারভোগীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে পরিবর্তনের চিত্র। গাইবান্ধা সদরের মারুফা বেগম বলেন, আগে কখনো ভাবিনি নিজের হাতে আয় করতে পারব। এখন ক্রোশেট পুতুল বানিয়ে প্রতি মাসে কিছু টাকা আয় করছি। এতে সংসারে সাহায্য করতে পারছি, নিজের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।

শিক্ষার্থী নওশিন নদী বলেন, ঝুড়ি তৈরি করে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে নিজের খরচ চালাতে পারছি। এটা আমার জন্য বড় অর্জন। সামনে আরও বড় পরিসরে কাজ করার ইচ্ছা আছে।

অন্যদিকে, ফুলছড়ির রবিদাস সম্প্রদায়ের লক্ষী রানী জানান, মুরগি পালন শুরু করেছি। ডিম ও বাচ্চা থেকে আয় বাড়বে- এই আশায় আছি। এতে আমাদের সংসারের অবস্থা কিছুটা বদলাবে।

গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল নারী দিপালী হাসদা বলেন, শূকর পালন আগে করতাম, কিন্তু এখন প্রশিক্ষণ নিয়ে আরও ভালোভাবে করতে পারছি। এতে আয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

প্রকল্প কর্মকর্তা রেশমা পারভীন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে বলেন, প্রথম পর্যায়ে আমরা নারীদের কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছি। এখন তারা উৎপাদন ও আয়মুখী কর্মকান্ডে যুক্ত হচ্ছে। অনেকেই ইতোমধ্যে নিয়মিত আয় শুরু করেছেন। এখন আমরা বাজার সংযোগ আরও জোরদার করে তাদের আয় বাড়ানোর নিয়ে কাজ করছি।

চলতি বছরের মার্চে ঢাকায় জাতীয় পাটমেলায় অংশগ্রহণ ছিল এই প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। সেখানে অংশ নেওয়া নারীরা নিজেদের তৈরি পণ্য প্রদর্শনের সুযোগ পান। ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং বাজার সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দিয়েছে।তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেক নারীর বাড়িতে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় উৎপাদন ও পশুপালনে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। উন্নত নকশা ও পণ্যের মানোন্নয়নে আরও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। বড় বাজারে প্রবেশের সুযোগ এখনও সীমিত।

প্রান্তিক নারীদের ওপর এই প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে অবলম্বন-এর নির্বাহী পরিচালক প্রবীর চক্রবর্তী বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে নারীরা শুধু আয় করছেন না, তারা পরিবার ও সমাজে নিজের অবস্থানও শক্ত করছেন। ছোট আয়ের মাধ্যমেও তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিচ্ছেন, যা সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।

তিনি আরও বলেন, আমরা দেখছি, নারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আগ্রহ অনেক বেড়েছে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বাজারসংযোগ এবং সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।

সব মিলিয়ে, কারিগরি দক্ষতাকে কেন্দ্র করে গাইবান্ধার প্রান্তিক নারীদের জীবনে শুরু হয়েছে নতুন এক যাত্রা। ছোট ছোট আয়ের পথই তাদের সামনে বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সংসারের গন্ডি পেরিয়ে তারা এখন অর্থনীতির সক্রিয় অংশ- নিজেদের জীবন বদলানোর পাশাপাশি বদলে দিচ্ছেন সমাজের চিরাচরিত দৃষ্টিভঙ্গিও।