Image description

বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে ‘জঙ্গিবাদ’ শব্দটি গত দুই দশক ধরে এক রহস্যময় এবং আতঙ্কের আখ্যান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কখনো এটি আবির্ভূত হয়েছে প্রকৃত জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে, আবার কখনো একে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক গদি রক্ষার ঢাল বা প্রতিপক্ষ দমনের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে। বিশেষ করে ২০০১-২০০৬ সালের সিরিজ বোমা হামলা থেকে শুরু করে বিগত ফ্যাসিবাদী আমলের ‘জঙ্গি নাটক’-এই দীর্ঘ পরিক্রমায় জনমনে এক গভীর সংশয় ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। 

বর্তমানে টিটিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) বা নতুন কোনো জঙ্গি সেলের উত্থানের খবর যখন সামনে আসছে, তখন প্রশ্নটি আবার বড় হয়ে দেখা দিয়েছে- আমরা কি সত্যিই কোনো নতুন উগ্রবাদী হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে, নাকি এটি এখনও সেই পুরনো ‘জঙ্গিবাদ’ নামক জুজু, যা ভিন্ন কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির বাংলাদেশবিরোধী পরিকল্পনার অংশ?

অতীতের ক্ষত: ২০০১-২০০৬ ও একযোগে বোমা বিস্ফোরণ: ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারকে বিব্রত করার নানামুখী ষড়যন্ত্র প্রত্যক্ষ করেছিল দেশবাসী। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে একদিনে কয়েকশ বোমা বিস্ফোরণের সেই রহস্যজনক ঘটনা আজও অমীমাংসিত। বিদেশি আধিপত্যবাদী শক্তি এবং তাদের এদেশীয় এজেন্টদের নিবিড় পরিকল্পনা ব্যতীত দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় একই দিনে এমন সুশৃঙ্খল সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটানো প্রায় অসম্ভব ছিল। ওই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে একটি ‘ইসলামি জঙ্গি রাষ্ট্র’ হিসেবে চিহ্নিত করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে এক-এগারোর বিতর্কিত পটভ‚মি তৈরিতেও ভূমিকা রাখে। বিগত পনেরো বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এই ঘটনার প্রকৃত কুশীলবদের শনাক্ত করার কোনো উদ্যোগ না নেয়াটা প্রমাণ করে যে, তৎকালীন শাসকরা হয়তো থলের বিড়াল বেরিয়ে যাওয়ার ভয়ে তটস্থ ছিল।

ফ্যাসিবাদী বয়ান ও ‘জঙ্গি কার্ড’ রাজনীতি: বিগত দেড় দশকে উগ্রবাদকে একটি সুনিপুণ ‘পলিটিক্যাল টুল’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যখনই কোনো গণদাবি বা সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়েছে, তখনই নাটকীয় কায়দায় কোনো না কোনো ‘জঙ্গি আস্তানা’র খোঁজ মিলেছে। রুদ্ধশ্বাস অভিযানের অবাস্তব চিত্রনাট্য এবং রহস্যময় ‘আয়নাঘর’ কেন্দ্রিক রাজনীতি সাধারণ মানুষের মনে গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি পেতে জঙ্গি ইস্যুকে যেভাবে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর এক বিশাল আস্থাহীনতার বোঝা তৈরি করেছে। ফলে বর্তমানে প্রকৃত কোনো গোয়েন্দা তথ্য থাকলেও সাধারণ মানুষ তাকে শুরুতে ‘পুরনো নাটক’ হিসেবে দেখার প্রবণতা দেখাচ্ছে।

টিটিপি ও বর্তমান প্রেক্ষাপট: নতুন কোনো গভীর পরিকল্পনা: বর্তমানে পাকিস্তানের টিটিপির সঙ্গে আফগান তালেবান এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর যোগসূত্র নিয়ে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নানা আলোচনা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে যদি সত্যি টিটিপির উত্থান ঘটে থাকে, তবে একে শুধু স্থানীয় বিপথগামী ব্যক্তিদের কাজ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একে ২০০১-২০০৬ সালের অনুরূপ বিদেশি কোনো আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের বাংলাদেশবিরোধী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা আবশ্যক।

তবে গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্লেষণে আরেকটি দিকও উঠে আসছে। ডিজিটাল জগতের অন্ধকার অলিগলিতে এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে উগ্রবাদী প্রচারণা চললেও, তার প্রকৃত ভিত্তি কতটুকু তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। যদি কেবল অনলাইনে তরুণরা বিভ্রান্ত হয়ে থাকে, তবে সরকারের উচিত সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে গণমাধ্যমের সহায়তা নিয়ে জনগণকে সতর্ক করা। কিন্তু কাল্পনিক জঙ্গি হামলা নিয়ে সরকারি সূত্র থেকে অতিরিক্ত প্রচারণা রাষ্ট্রের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। এ জাতীয় প্রচারণা ভারতে পালিয়ে থাকা আওয়ামী সন্ত্রাসী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বরখাস্তকৃত অপরাধীদের নাশকতার পরিকল্পনায় উৎসাহিত করতে পারে।

আস্থাহীনতা বনাম প্রকৃত সতর্কতা: নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, উগ্রবাদ একটি ছাইচাপা আগুনের মতো। তবে ‘নেকড়ে আসার গল্পে’র মতো বারবার মিথ্যা জঙ্গি নাটকের কারণে আজ সত্যটুকুও বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন সময় এসেছে ২০০১-০৬ সালের সেই সিরিজ বোমা হামলার প্রকৃত কুশীলবদের চেহারা উন্মোচন করার। যদি অতীতের ষড়যন্ত্রগুলো সঠিকভাবে উদঘাটন করা যায়, তবে বর্তমানের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা সহজ হবে।

এ বিষয়ে দেশের প্রবীণ সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান তার এক মন্তব্য প্রতিবেদনে লিখেছেন, পাকিস্তানি তালেবান নামে পরিচিত টিটিপির সঙ্গে বাংলাদেশের টিটিপির সম্পর্কের বিষয়টি এখনো ঠিকমতো পরিষ্কার নয়। এটাও জানা যায়নি যে, বাংলাদেশে টিটিপি নামে কোনো জঙ্গি সংগঠনের আদৌ অস্তিত্ব আছে কি না, নাকি অভিযুক্ত পুলিশ ও বিমান বাহিনীর সদস্যসহ আরো কিছু বিপথগামী বাংলাদেশি তরুণ শুধু অনলাইনে মগজধোলাই হয়ে পাকিস্তানি তালেবানের সদস্য হয়েছে। ফ্যাসিস্ট আমলে কিছুদিন পরপর বিচিত্র সব নামের কথিত জঙ্গি সংগঠন আবিষ্কারের মাধ্যমে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আয়নাঘর ইত্যাদি পদ্ধতিতে ভয়াবহ সব মানবাধিকার লঙ্ঘন জায়েজ করা হতো। টিটিপির গল্প তখন শোনা যায়নি। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে জনগণ পুরনো সেসব নাটকের মঞ্চায়ন আর দেখতে চায় না। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের প্রচারণা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। হতে পারে এই নতুন বয়ান সেই প্রচারণারই অংশ।

যা বলছে সরকার: এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে ‘উগ্রবাদী সংগঠনের’ হামলার বিষয়ে পুলিশ সতর্ক থাকলেও দেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই। ‘ফ্যাসিবাদী আমলের সময় তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। বর্তমানে বাংলাদেশে সেগুলোর অস্তিত্ব নেই।’