‘মা, আমি সাগরে যাই। তোরে বিকাশে টাকা পাঠাইছি তোর মাকে নিয়া ডাক্তার দেখাইস। ভালো মাছ পাইলে এবার আইয়া সব ঋণ পরিশোধ কইরা দিমু আর নাতির জন্য একটা সাইকেল কিইন্যা দিমু’, ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বড় টেংরা গ্রামের আবুল কালাম কালু মাঝির মেয়ে ফাহিমা আক্তারকে মোবাইলে কথাগুলো বলেছিলেন।
ট্রলারটি ঝড়ের কবলে পড়ায় আর ফিরে আসেননি কালাম মাঝি। মেয়ে ফাহিমা এখনও বাবার পথ চেয়ে আছেন। একই গ্রামের ১৮ বছরের নাদিম। সাগরে যেতে ছিল তার ভয়। তবুও অভাবের সংসারে অনেকটা মায়ের জোরাজুরিতেই গিয়েছিলেন সমুদ্রে মাছ ধরতে। নাদিমও ফিরে আসেননি। এক বুক হতাশা আর অনুশোচনা নিয়ে মা ফাতেমাও অপেক্ষায়। উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে আছে এমন হাজারো গল্প, অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর না-ফেরার বেদনায় ভরা। আমরা যখন শ্রমিক অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের কথা বলি, তখন সাধারণত শহুরে শ্রমজীবী মানুষের কথাই বেশি আলোচনায় আসে।
কিন্তু দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসরত মৎস্যজীবী যাদের আমরা ‘জেলে’ নামে চিনি তারা এই আলোচনার বাইরে থেকেই যায়। অথচ তাদের শ্রম, সংগ্রাম এবং অবদান কোনো অংশেই কম নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে তারা আরও বেশি ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করেন। উপক‚লের জেলেরা প্রতিদিনই সমুদ্রের অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি, অন্যদিকে দস্যুতার ভয় এর মাঝেই তারা নামেন নোনা জলে, প্রায় বিনা নিরাপত্তায়। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, কার্যকর বীমার অভাব এবং দুর্বল নিরাপত্তা কাঠামো এই শ্রমজীবী মানুষদের জীবনের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। উপকূলীয় জেলেদের জীবন প্রকৃতিনির্ভর এবং অত্যন্ত অনিশ্চিত। প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে তারা উত্তাল সাগরে পাড়ি জমান, যেখানে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা আকস্মিক আবহাওয়ার পরিবর্তন তাদের নিত্যসঙ্গী। একটি ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা দুর্যোগ মুহূর্তেই কেড়ে নিতে পারে তাদের জীবন। তবুও জীবিকার তাগিদে তারা এই ঝুঁকি নিতে বাধ্য হন। এই দিক থেকে তাদের কর্মপরিবেশ যে কতটা বিপজ্জনক, তা সহজেই অনুমেয়।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও জেলেরা নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের উপর নির্ভরশীল, যারা কম দামে মাছ কিনে বেশি দামে বিক্রি করে। ফলে জেলেরা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হন। এছাড়া মাছ ধরার উপর মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা থাকায় বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় তারা সম্পূর্ণ কর্মহীন হয়ে পড়েন। এই সময়টাতে পর্যাপ্ত বিকল্প আয়ের সুযোগ বা সরকারি সহায়তা না থাকায় তাদের পরিবারগুলো চরম সংকটে পড়ে। সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও জেলেরা অনেক পিছিয়ে। দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় তাদের জন্য কার্যকর কোনো সহায়তা ব্যবস্থা প্রায় নেই।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের সন্তানরাও উন্নত জীবনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, ফলে দারিদ্র্যের চক্র প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতে থাকে। আমরা শ্রমিকের অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের কথা জোরালোভাবে উচ্চারণ করি। শহরের ব্যস্ত সড়ক থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গন সবখানেই শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়। আমি বলছি না যে জেলেদের নিয়ে একেবারেই হয় না, গত কয়েক বছর ধরে আলোচনা হয় কিন্তু সেটি উল্লেখযোগ্য নয়, সরকারসহ কর্তাদের কাছ পর্যন্ত পৌঁছায় না।
উপকূলীয় অঞ্চলের জেলেরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ও জীবনবাজি রেখে দেশের মৎস্য চাহিদা পূরণ করছেন, তাদের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত মর্মান্তিক। দেশীয় সংগঠন যেমন বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি এবং আন্তর্জাতিক চাপ সব মিলিয়ে এই খাতে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কিছু অগ্রগতি দৃশ্যমান। যদিও বাস্তবতা এখনও নিখুঁত নয়, তবু গার্মেন্ট শ্রমিকদের কণ্ঠ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শোনা যায়।
এছাড়াও চা শ্রমিকদের অধিকার নিয়েও দীর্ঘ বছর আন্দোলন করার পর তাদের কিছুটা পরিবর্তন হলেও উল্লেখযোগ্য নয়। শ্রম আইনে শ্রমিকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া থাকলেও উপক‚লের জেলেদের জন্য সে ব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে উপক‚লের জেলেদের জীবন যেন এক অনবরত অনিশ্চয়তার গল্প। তারা প্রতিদিন জীবনবাজি রেখে সমুদ্রে যায় ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, কিংবা দস্যুতার ঝুঁকি নিয়ে। অনেক সময় ট্রলার ডুবে মৃত্যু ঘটে, কিন্তু সেই খবর খুব কমই জাতীয় আলোচনায় আসে। তাদের জন্য নেই কোনো শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠন, নেই কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, নেই নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা, নেই স্বাস্থ্য সুরক্ষা।
প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যায় আমাদের উপকূলীয় শত শত জেলের জীবন কেড়ে নেয়। মাছের নেশায় জেলেরা গভীর সমুদ্র যায়। সেখানে গিয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় তারা আবহাওয়ার তথ্য পায় না। নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ সময় নৌবাহিনী বা কোস্ট গার্ড গভীর সমুদ্রে তেমন টহল চালায় না। প্রশাসনের উচিত সিগন্যাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীতে রেড অ্যালার্ট জারি করা এবং সমুদ্রে সতর্কবার্তা দেয়া।
এছাড়াও জেলেরা যখন মাছ শিকারে যান, তখন কে কার ট্রলারে যায়, সেটার কোনো তথ্য থাকে না। ট্রলার মালিক সমিতির উচিত, কার ট্রলারে কোন জেলে যাচ্ছে, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহসহ নাম নিবন্ধন করা। নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি ট্রলারে সংখ্যা ভিত্তি করে লাইফ জ্যাকেট, বয়াসহ নিরাপত্তা সামগ্রী দেয়ার কথা থাকলেও মালিকপক্ষ তা দেয় না। ফলে গভীর সমুদ্রে ঝড়ের কবলে পড়ে অনেক জেলে নিখোঁজ হন এবং মারাও যান। দারিদ্র্যতার কারণে তরুণ ছেলেরা অল্প বয়সেই ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশায় ঢুকে পড়ে, শিক্ষার সুযোগ হারায়।
প্রশ্ন হচ্ছে শ্রমিক অধিকার কি শুধু দৃশ্যমান শিল্প খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে? যারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান রাখছে, যারা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়ছে, যারা প্রতিনিয়ত জীবনবাজি রেখে সাগরে মাছ শিকার করে, পরিবার থেকে বিদায় নিয়ে যায়, আর ফিরে আসবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এর মতো শক্ত আইনি সুরক্ষা এখনো তাদের জন্য পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়।
এ জন্যই জেলেদের জন্য আলাদা আইন এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। শ্রমিক মানে শুধু কারখানার শ্রমিক নয় শ্রমিক মানে সেই মানুষটিও, যে ভোরের আলো ফুটতেই নৌকা নিয়ে সমুদ্রে পাড়ি জমায়। যে অন্ধকার ভোরে প্রিয়জনের মুখটা একবার দেখে, তারপর অনিশ্চিত সমুদ্রের দিকে নৌকা ঠেলে দেয়। উপক‚লীয় মৎস্যজীবীরা আমাদের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তারা এখনো অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাই তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনাকে সামনে এনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হলেই কেবল তাদের জীবন হবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ, আর তবেই সত্যিকার অর্থে শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে দেশের প্রতিটি স্তরে।
লেখক: সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট




Comments