Image description

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের বড় ধরনের বিপর্যয় বা পতনের কারণ নিয়ে নতুন করে কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে। কলকাতার প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের এক বিশেষ বিশ্লেষণে তৃণমূলের এই পরিস্থিতির পেছনে আটটি প্রধান কারণকে দায়ী করেছে। 

নিচে সেই কারণগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

১. দীর্ঘ শাসনামলের নেতিবাচক প্রভাব: টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে সরকারের বিরুদ্ধে জনমানসে একটি বড় ধরনের প্রতিষ্ঠানবিরোধী বা ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি’ হাওয়া তৈরি হয়েছিল। নিচুতলার নেতাদের ‘সিন্ডিকেট রাজ’ এবং ক্ষমতার দাপট সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে, যার সংশোধন করার সুযোগ থাকলেও শীর্ষ নেতৃত্ব তা কাজে লাগাতে পারেনি।

২. পাহাড়সম আর্থিক দুর্নীতি: তৃণমূল শাসনের শেষ কয়েক বছরে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, রেশন কেলেঙ্কারি, এবং কয়লা-গরু পাচারের মতো গুচ্ছ গুচ্ছ দুর্নীতির অভিযোগ জনমনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বান্ধবীর বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া টাকার পাহাড় মমতার স্বচ্ছ ভাবমূর্তিকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

৩. ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতা (এসআইআর): নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) ফলে তালিকা থেকে বিপুল পরিমাণ ভুয়া, মৃত ও অস্তিত্বহীন ভোটার বাদ পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘ভুতুড়ে’ ভোটাররাই ছিল তৃণমূলের জয়ের বড় অস্ত্র। এছাড়া এই প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

৪. তোষণের অভিযোগ ও প্রতিবেশী দেশের প্রভাব: বিজেপির পক্ষ থেকে মমতার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক তোষণের অভিযোগ বরাবরই ছিল। এছাড়া প্রতিবেশী বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তন ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের জনমতকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করছে আনন্দবাজার।

৫. প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো: নির্বাচনের আগে রাজ্য প্রশাসনের ওপর থেকে তৃণমূলের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় নির্বাচন কমিশনের হাতে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীকে আক্ষেপ করে বলতে হয়েছে, ডিজি বা মুখ্যসচিব তার ফোন ধরছেন না।

৬. ‘সন্ত্রাস’ প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় বাহিনী: পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে যে পেশিশক্তির দাপট দেখা যায়, এবার কেন্দ্রীয় বাহিনীর রুদ্রমূর্তির কারণে তা সম্ভব হয়নি। কেন্দ্রীয় বাহিনীর ধারাবাহিক টহল তৃণমূলের ‘ভোট ম্যানেজার’দের বেকায়দায় ফেলে দেয়।

৭. নির্বিঘ্ন ও রেকর্ড ভোটদান: অতীতে ভোট জ্যাম বা ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ থাকলেও, এবার দুই দফায় শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ বড় ব্যবধান গড়ে দিয়েছে। কোনো ধরনের প্রাণহানি ছাড়াই ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারায় বিরোধী শিবিরের ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

৮. আই-প্যাক বিপর্যয়: তৃণমূলের ভোট কৌশলী সংস্থা আই-প্যাকের ওপর ইডির অভিযান এবং তাদের এক পরিচালকের গ্রেপ্তার হওয়া ছিল বড় ধাক্কা। ভোটের ঠিক আগে আই-প্যাক তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ায় তৃণমূলের সাংগঠনিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে এবং মাঠপর্যায়ের জনসংযোগ ব্যাহত হয়।

মানবকণ্ঠ/আরআই