নগদ টাকা ব্যবহারের ঝামেলা এড়ানো এবং দেশে একটি নিরাপদ 'ক্যাশলেস' (নগদবিহীন) অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবার স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সড়ক যোগাযোগ খাতে 'বাংলা কিউআর' (Bangla QR) ব্যবহারের পরিধি বাড়ানোর বড় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। হাসপাতালের সাধারণ টিকিট কেনা থেকে শুরু করে স্কুলের বেতন, ক্যান্টিনের বিল কিংবা সড়ক ও সেতুর টোল আদায়ে সরাসরি এ ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতি চালুর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলা কিউআরের সার্বিক অগ্রগতি ও আগামী তিন মাসের কর্মপরিকল্পনা বিস্তারিত তুলে ধরেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সর্বস্তরে বাংলা কিউআর পেমেন্ট প্রসারের লক্ষ্যে গভর্নর এবং ডেপুটি গভর্নরের নেতৃত্বে আলাদা স্টীয়ারিং ও কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS), পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। ইতিমধ্যে দেশের ১৯টি জেলায় ব্যবসায়ী সংগঠন ও সাধারণ মানুষের মতামত নিয়ে পেমেন্ট চার্জ কমানোসহ একাধিক সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা ১ অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে বছরের শেষ নাগাদ কার্যকর করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের গত ৩০ জুন থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন গুণ এবং লেনদেনের মোট অর্থমূল্য প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সারাদেশে বাংলা কিউআর ব্যবহারকারী মার্চেন্টের সংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় ৪০ লাখে। শুধু সম্প্রতিক এক সপ্তাহেই এই ব্যবস্থায় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ১৪৩ কোটি টাকা।
মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ক্যাশলেস অর্থনীতির মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড বা 'তথ্যচিহ্ন' নিশ্চিত করা। এটি বাস্তবায়িত হলে অনানুষ্ঠানিক খাতের বিশাল লেনদেনও মূল হিসাবের আওতায় আসবে এবং দেশের প্রকৃত অর্থনীতির আকার দৃশ্যমান হয়ে বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ সহজ হবে। মুদি দোকান বা ছোটখাটো কেনাকাটায় খুচরা বা ভাংতি টাকার সংকট এবং পুরোনো মলিন নোট নিয়ে যে ভোগান্তি হয়, কিউআর স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ চালু হলে তার স্থায়ী সমাধান মিলবে।
নতুন উদ্যোগে স্বাস্থ্য খাতে বহির্বিভাগের টিকিট কেনা সহজ হবে; শিক্ষা খাতে স্কুলের বেতন পরিশোধের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ক্যান্টিন ও ছোটখাটো শিক্ষা উপকরণ কেনায় কিউআর পেমেন্ট যুক্ত করা হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও বেসরকারি স্কুলের বেতন ক্যাশলেস করার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এছাড়া পদ্মা সেতুসহ প্রধান সড়কগুলোর টোল প্লাজায় কিউআর কোড স্ক্যান করে দ্রুত টোল পরিশোধের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যা টোলের দীর্ঘ সারি ও সময় অপচয় কমাবে।
ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (MDR) বা সার্ভিস চার্জ সর্বনিম্ন ও সাশ্রয়ী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সাথে বাংলা কিউআরের সর্বজনীন সুবিধা (Interoperability) থাকায় যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ থেকে একটি মাত্র কিউআর কোড স্ক্যান করে কেনাকাটার বিল পরিশোধ করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আশাবাদ ব্যক্ত করেছে যে, আগামী তিন মাসের সমন্বিত পদক্ষেপে দেশের দৈনন্দিন ছোট ছোট লেনদেনের সিংহভাগ অংশই ডিজিটাল নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে।
ডিআর




Comments