Image description

প্রকৃতির নিয়মে বছর ঘুরে আবার এসেছে শীত। হিমেল হাওয়া আর ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে চারপাশ। আমাদের সামর্থ্যবানদের জন্য শীত মানেই হয়তো আরামদায়ক কম্বল, লেপ কিংবা বাহারি শীতবস্ত্রের উষ্ণতা। কিন্তু সমাজের সুবিধাবঞ্চিত, নিঃস্ব আর ছিন্নমূল মানুষের কাছে এই শীত এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। কনকনে ঠান্ডায় খোলা আকাশের নিচে বা জীর্ণ কুটিরে খড়কুটো জ্বালিয়ে রাত পার করা এই মানুষগুলোর আর্তনাদ আমাদের মানবিক ও ধর্মীয় দায়বদ্ধতাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে।

মানবসেবা ও আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “তাদের (বিত্তবানদের) ধন-সম্পদে অভাবী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।” (সূরা যারিয়াত, আয়াত: ১৯)। অর্থাৎ, দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো কেবল দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি তাদের পাওনা বা অধিকার।

হাদিসের আলোকে শীতবস্ত্র বিতরণের গুরুত্ব
অসহায় মানুষকে কাপড় বা কম্বল দিয়ে সাহায্য করার সওয়াব অত্যন্ত বেশি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে মুসলমান অন্য কোনো মুসলমানকে বস্ত্রহীন অবস্থায় বস্ত্র দান করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের সবুজ রঙের পোশাক পরিধান করাবেন।” (আবু দাউদ)।

অন্য এক হাদিসে এসেছে, প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ ততক্ষণ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে।” (মুসলিম)। তীব্র শীতে কাঁপতে থাকা একজন মানুষের গায়ে একটি চাদর বা কম্বল জড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে যে প্রশান্তি পাওয়া যায়, তা আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্যতম মাধ্যম হতে পারে।

সৃষ্টির সেবায় স্রষ্টার সন্তুষ্টি
ইসলামি তত্ত্বে ‘খিদমতে খালক’ বা সৃষ্টির সেবা ইবাদতেরই অংশ। শীতের কষ্ট থেকে মানুষকে বাঁচাতে এগিয়ে আসা মুমিনের অন্যতম গুণ। হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত আছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা বলবেন, “হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে কাপড় চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে কাপড় দাওনি। বান্দা বলবে—হে আল্লাহ! আপনি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালক, আপনাকে আমি কীভাবে কাপড় পরাব? আল্লাহ বলবেন—আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে কাপড় চেয়েছিল, তুমি তাকে কাপড় দাওনি। তুমি কি জানতে না যে, তাকে কাপড় পরালে আজ তা আমার কাছে পেতে?” (সহিহ মুসলিম)।

বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো: অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা
কেবল ইসলাম নয়, পৃথিবীর সকল ধর্মই আর্তমানবতার সেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। হিন্দুধর্মে বলা হয়েছে, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’। অর্থাৎ সৃষ্টির সেবা করলে স্রষ্টার সেবা করা হয়। বৌদ্ধধর্মে অহিংসা ও করুণাকে শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলা হয়েছে। খ্রিস্টধর্মেও দুস্থদের সাহায্য করার প্রতি বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। তাই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের পরম নৈতিক দায়িত্ব।

আমাদের করণীয়
শীতের এই কঠিন সময়ে আমরা ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক প্রচেষ্টায় অনেক কিছু করতে পারি:
নিজের অব্যবহৃত কিন্তু ভালো মানের শীতবস্ত্রগুলো পরিষ্কার করে অভাবীদের দান করা।
নতুন কম্বল বা গরম কাপড় কিনে ছিন্নমূল মানুষের মাঝে বিতরণ করা।
পাড়ায় বা মহল্লায় তরুণরা মিলে ‘তহবিল’ গঠন করে সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করা।
সামর্থ্য থাকলে শীতার্তদের মাঝে পুষ্টিকর ও গরম খাবার পরিবেশন করা।

শীতের তীব্রতায় যখন কোনো শিশুর কান্না কিংবা কোনো বৃদ্ধের থরথর কাঁপুনির দৃশ্য আমাদের সামনে ভেসে ওঠে, তখন একজন প্রকৃত ধার্মিক মানুষ ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন না। আসুন, পরকালীন মুক্তি এবং ইহকালীন মানসিক প্রশান্তির আশায় আমরা আমাদের সাধ্যমতো শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই। আপনার দেওয়া একটি সামান্য কম্বল হয়তো রক্ষা করতে পারে একটি অমূল্য প্রাণ, আর আপনাকে এনে দিতে পারে মহান স্রষ্টার সীমাহীন করুণা।

মনে রাখবেন, মানুষের কল্যাণেই ধর্মের সার্থকতা। শীত আসুক উষ্ণতার বার্তা নিয়ে, কোনো মানুষের কান্নার কারণ হয়ে নয়।