ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এখানে ব্যক্তিগত সৌন্দর্য ও পবিত্রতার যেমন প্রশংসা করা হয়েছে, তেমনি সামাজিক ফিতনা বা বিশৃঙ্খলা রোধে কিছু সীমারেখাও টেনে দেওয়া হয়েছে। নারীদের সুগন্ধি ব্যবহারের বিষয়টি মূলত তাদের অবস্থান ও উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
ঘরের অভ্যন্তরে বা স্বামীর সামনে সুগন্ধি ব্যবহার
ইসলামি শরিয়তে নারীদের জন্য সাজসজ্জা ও সুগন্ধি ব্যবহারের সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হলো তাদের ঘর। বিশেষ করে স্বামীর জন্য সুগন্ধি ব্যবহার করা কেবল জায়েজই নয়, বরং এটি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এটি দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা বৃদ্ধি করে। এছাড়া নিজের ঘরে বাবা, ভাই বা মাহরাম (যাদের সাথে বিয়ে হারাম) আত্মীয়দের উপস্থিতিতেও সুগন্ধি ব্যবহার করা বৈধ, যদি সেখানে কোনো গায়রে মাহরাম (পরপুরুষ) না থাকে।
বাইরে যাওয়ার সময় সুগন্ধি ব্যবহারের বিধান
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, কোনো নারী যখন ঘরের বাইরে বের হবেন—সেটি বাজারে হোক, কর্মক্ষেত্রে হোক কিংবা মসজিদে—তখন এমন তীব্র সুগন্ধি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ, যার ঘ্রাণ পরপুরুষের নাকে পৌঁছায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। হাদিসে এসেছে:
"যে নারী সুগন্ধি মেখে কোনো জনসমষ্টির পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যেন তারা তার ঘ্রাণ পায়, সে একজন ব্যভিচারিণী।" (সুনানে তিরমিজি: ২৭৮৬, সুনানে নাসায়ি: ৫১২৯)
এখানে 'ব্যভিচারিণী' বলার উদ্দেশ্য হলো, এটি ব্যভিচারের প্ররোচনা দেয় এবং পরপুরুষের দৃষ্টি ও মনের কুচিন্তাকে জাগ্রত করে।
নারীদের সুগন্ধির ধরণ কেমন হওয়া উচিত?
রাসুলুল্লাহ (সা.) পুরুষ ও নারীদের সুগন্ধির মধ্যে পার্থক্য করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
"পুরুষের সুগন্ধি এমন হবে যার ঘ্রাণ প্রকাশ পায় কিন্তু রং গোপন থাকে। আর নারীদের সুগন্ধি এমন হবে যার রং প্রকাশ পায় কিন্তু ঘ্রাণ গোপন থাকে।" (সুনানে তিরমিজি: ২৭৮৭)
প্রাচীনকালে জাফরান বা বিশেষ রঞ্জক পদার্থ নারীরা ব্যবহার করতেন যা কেবল ত্বকে দৃশ্যমান হতো কিন্তু তীব্র ঘ্রাণ ছড়াত না। বর্তমান যুগে এর অর্থ হলো—নারীরা বাইরে বের হওয়ার সময় এমন মৃদু কিছু ব্যবহার করতে পারেন যা কেবল নিজের শরীরের দুর্গন্ধ দূর করে, কিন্তু অন্যের মনোযোগ আকর্ষণ করার মতো তীব্র সুবাস ছড়ায় না।
মসজিদে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা
ইবাদতের উদ্দেশ্যে মসজিদে যাওয়ার সময়ও নারীদের জন্য তীব্র সুগন্ধি ব্যবহার নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের কেউ যখন মসজিদে উপস্থিত হয়, সে যেন সুগন্ধি স্পর্শ না করে।" (সহিহ মুসলিম: ৪৪৩)
এমনকি কোনো নারী যদি সুগন্ধি মেখে মসজিদে যায়, তবে তার সালাত কবুলের জন্য সেই সুগন্ধি ধুয়ে ফেলার (গোসল করার) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন এই বিধিনিষেধ?
ইসলামের এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো নারীর মর্যাদা রক্ষা করা এবং সমাজকে চারিত্রিক অবক্ষয় থেকে বাঁচানো। সুগন্ধি মানুষের কামভাব ও আকর্ষণকে উদ্দীপ্ত করে। পরপুরুষ যখন কোনো নারীর তীব্র সুবাস পায়, তখন তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। এই অনাকাঙ্ক্ষিত আকর্ষণ থেকে নারীকে নিরাপদ রাখতেই ইসলাম এই সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে।
সারসংক্ষেপ
-
বাসায়: প্রাণখুলে পছন্দের যেকোনো সুগন্ধি ব্যবহার করুন।
-
বাইরে যাওয়ার সময়: তীব্র পারফিউম বা আতর এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে হালকা মানের ডিওডোরেন্ট বা রোল-অন ব্যবহার করতে পারেন যা শুধু শরীরের ঘামের দুর্গন্ধ রোধ করে, কিন্তু ঘ্রাণ ছড়ায় না।
-
নারীদের মজলিসে: যেখানে শুধু নারীরাই থাকবেন, সেখানে সুগন্ধি ব্যবহার করা জায়েজ। তবে যাতায়াতের পথে যদি পরপুরুষের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে সতর্কতা অবলম্বন করাই শ্রেয়।
ইসলাম নারীকে বন্দি করেনি, বরং তাকে দিয়েছে প্রকৃত সম্মান ও সুরক্ষা। সুগন্ধি আল্লাহর নিয়ামত, আর এর সঠিক ও পরিমিত ব্যবহারই একজন মুমিন নারীর ভূষণ। পর্দার বিধান ও লজ্জাশীলতা বজায় রেখে সুগন্ধি ব্যবহার করাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।
Comments