১৪ই শাবান দিবাগত রজনী পবিত্র লাইলাতুল বরাত যা আমাদের উপমহাদেশে শবে বরাত নামে পরিচিত। মহান আল্লাহ তায়ালা যে সমস্ত বরকতময় রজনীতে তার বান্দাদের প্রতি করুণার দৃষ্টি দান করে থাকেন, শবে বরাত তারই অন্যতম।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সালফে সালেহীন এবং বিজ্ঞ মনীষীগণ এ রাতটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পালন করেছেন। অনুরূপভাবে যুগে যুগে মুসলমানগণ এরই ধারাবাহিকতায় এ রাতটি পালন করে আসছেন।
আরবী ১২ মাসের অষ্টম মাস শাবান। শাবানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতটি কোরআনের ভাষায়- ليلة مباركة (লাইলাতুম মুবারাকা) বা বরকতময় রজনী, আর হাদীসের ভাষায়- ليلة النصف من شعبان (লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান) বা শাবানের মধ্য রজনী।
তাফসীরের ভাষায়- ليلة الصك (লাইলাতুছ ছাক) বা সনদ প্রাপ্তির রাত্রি, ليلة النجاة (লাইলাতুন নাজাহ) তথা মুক্তি রজনী।
আর আমাদের উপমহাদেশে যাকে শবে বরাত বলে আমরা জেনে থাকি। ফারসী ভাষা থেকে উদ্ভূত। শব (شب) বা রাত ও বরাত (برات) বা ভাগ্য পবিত্রতা, নাজাত, মুক্তি, ত্রাণ ইত্যাদি।
আমাদের এই অঞ্চল বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠী দ্বারা শাসিত হয়েছে, যার ফলে ঐ সকল জাতিগোষ্ঠীর ভাষা সংস্কৃতি আমাদের ভাষা সংস্কৃতির সাথে সংমিশ্রণ হয়ে গেছে, যার দরুন আমাদের এখানে প্রচলিত অনেক শব্দই বিভিন্ন ভাষা থেকে দখল করে আছে। ইসলামিক পরিভাষার ক্ষেত্রেও অনেক শব্দকে আমরা এমনটি দেখতে পাই, যেমন নামাজ, রোজা, বেহেস্ত, দোযখ, যে শব্দগুলি মূল আরবি ভাষা বা কুরআনের ভাষা থেকে না এসে ফারসি ভাষা থেকে যুক্ত হয়ে প্রচলিত হয়ে আসছে, অথচ কুরআনে এগুলিকে সালাত, সিয়াম, জান্নাত, জাহান্নাম, নামে অভিহিত করা হয়েছে। ঠিক তেমনি শবে বরাত শব্দটির ক্ষেত্রে ঘটেছে। যা নিসফু্স শাবান না হয়ে শবে বরাত নামে প্রচলিত হয়ে আসছে।
তাই বলে, নামাজ বললে সালাত আদায় হবে না, রোজা বললে সিয়াম পালন হবে না বিষয়টা এমন নয়, একইভাবে নিসফুস শাবান কে শবে বরাত বললে গুনা হবে বা পালন করা যাবে না বিষয়টি এমন নয়।
পবিত্র কুরআন ও নির্ভরযোগ্য মুফাসসিরগণের দৃষ্টিতে পবিত্র শবে বরাত:
মধ্য শাবানের রাত্রি যা কোরআনের পরিভাষায় লাইলাতুম মুবারাকা নামে পরিচিত। এ রাতটির মর্যাদা, অস্তিত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব কোরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
সূরা দুখানের ১-৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন :
পৃষ্ঠা - ২
حم-والكتاب المبين- إنا أنزلناه في ليلة مباركة- إنا كنا منذرين- فيها يفرق كل أمر حكيم-
হা-মীম, এ স্পষ্ট কিতাবের শপথ! নিশ্চয়ই আমি তা বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে বন্টন করে দেওয়া হয় প্রত্যেক হিকমতের কাজ।
এ আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে বিশ্ব বরেণ্য নির্ভরযোগ্য মুফাসসিরগণের মতামত :
১. তাফসীরে জালালাইন শরীফে ৪১০ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে-
ان انزلناه في ليلة مباركة هى ليلة القدر او ليلة النصف من شعبان نزل فيها من ام الكتاب من السماء السابعة الى السماء الدنيا انا كنا منذرين-
নিশ্চয়ই আমি তা বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। আর বরকতময় রাত হল লাইলাতুল কদর (কদরের রাত) অথবা লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান (শাবানের মধ্য রাত তথা শবে বরাত)। কেননা এই রাতে উম্মুল কিতাব (কোরআন শরীফ) ৭ম আসমান থেকে দুনিয়ার আসমানে (১ম আসমান) নাযিল হয়েছে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী।
২. তাফসীরে তাবারী শরীফ পৃষ্ঠা-২২, খন্ড ১০ -এ বর্ণিত আছে-
عن محمد بن سوفة, عن عكرمة فى قول الله تبارك وتعالى (فيها يفرق كل امر حكيم) قال: فى ليلة النصف من شعبان يبرم فيها امر السنة وتنسخ الاحياء من الاموات ويكتب الحاج فلا يزاد فيهم احد، ولا ينقص منهم احد.
كذا أخرج ابن جرير وابن منذر وابن أبى حاتم وكذا فى روح المعانى-
আল্লাহ তায়ালার বাণী فيها يفرق كل أمر حكيم এর তাফসীরে বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত ইকরামা (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মধ্য শাবানের রাত্রিতে বছরের সকল ব্যাপার চূড়ান্ত করা হয়, জীবিত ও মৃতদের তালিকা লেখা হয় এবং হাজীদের তালিকা তৈরি করা হয়। এ তালিকা থেকে একজনও কমবেশি হয় না।
৩. তাফসীরে কুরতুবী পৃষ্ঠা-১২৬, খন্ড ১৬ এ বর্ণিত আছে :
ولها أربعة أسماء: الليلة المباركة، وليلة البراءة، وليلة الصك، وليلة النصف من شعبান-
ইমাম কুরতুবী (রা:) বলেন, এ রাতের ৪ টি নাম আছে-
ক. লাইলাতুম মুবারাকা, খ. লাইলাতুল বারায়াত, গ. লাইলাতুছ ছাক, ঘ. লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান।
পবিত্র হাদীসের আলোকে লাইলাতুল বরাত : হাদিসে রাসূলে পাক সাঃ বলেন;
عن ابي موسى الاشعاري عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال ان الله تعالى ليطلع في ليلة النصف من شعبان فيغفر لجميع خلقه الا لمشرك او مشاحن (رواه ابن ماجه)
হযরত আবু মূসা আশয়ারী (রা:) রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমান- মধ্য শাবানের রাত্রিতে আল্লাহ পাক রহমতের তাজাল্লী ফরমান এবং তার সমস্ত বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু মুশরিক বা শত্রুতা পোষণকারী ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন না। (ইবনে মাজাহ শরীফ পৃ. ১০০ হাদীস নং-১৩৮৯, মিশকাত শরীফ-১১৫ পৃষ্ঠা)
মিশকাত শরীফের ১১৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে;
عن عائشة رضي الله عنها عن النبي صلى الله عليه وسلم قال هل تدرين ما في هذه الليلة يعنى ليلة النصف من شعبان قالت ما فيها يا رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال فيها ان يكتب كل مولود بنى ادم فى هذه السنة وفيها ان يكتب كل هالك من بنى ادم فى هذه السنة وفيها ترفع اعمالهم وفيها تنزل ارزاقهم- فقالت : يا رسول الله ما من احد يدخل الجنة الا برحمته الله تعالى؟ فقال : ما من احد يدخل الجنة الا برحمة الله تعالى - ثلاثا
উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- রাসূল (সাঃ) হযরত আয়েশা (রা:) কে জিজ্ঞেস করলেন- হে আয়েশা! শাবান মাসের মধ্য রাতের মর্যাদা ও বুযর্গী সম্পর্কে তুমি কি জান? তিনি আরজ করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাতের কি মর্যাদা রয়েছে? আল্লাহর হাবিব সাঃ উত্তরে বললেন-আগামী এক বছরে কতজন আদম সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে এবং কতজন আদম সন্তান মৃত্যুবরণ করবে তা এ রাত্রে লিপিবদ্ধ করা হয়। আর এ রাত্রিতে তাদের আমল মহান আল্লাহর দরবারে উপস্থাপন করা হয় এবং তাদের রিযিক অবতীর্ণ কিংবা নির্ধারণ করা হয়। অতঃপর হযরত আয়েশা (রা:) বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম "আল্লাহর রহমত ছাড়া কারো পক্ষে জান্নাতে যাওয়া সম্ভব নয়? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত ও একান্ত অনুগ্রহ ছাড়া কারো পক্ষে জান্নাতে যাওয়া সম্ভব নয়। এ কথাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার বললেন।এছাড়াও আরো অসংখ্য হাদিসে মধ্য শাবান বা শাবানের ১৪ই তারিখ দিবাগত রজনীতে এবাদত বন্দেগীর ফজিলত সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন।
এ রাতে আমাদের করণীয়:
ফরজ নামাজ সমূহ জামায়াত সহকারে আদায় করা।
কোরআন শরীফ তিলাওয়াত করা।
প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর বেশী বেশী দরুদ শরীফ পড়া।
বেশী বেশী নফল নামাজ আদায় করা।
সালাতুত তাসবীহ ও তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা।
মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন ও আউলিয়ায়ে কেরামসহ নিকটস্থ কবর জিয়ারত করা।
তাওবা করা, জিকির ও তাসবীহ-তাহলীল পড়া।




Comments