ফিতনার এই কঠিন যুগে ঈমান রক্ষা করা অনেকটা "হাতের তালুতে জ্বলন্ত অঙ্গার রাখার" মতো কঠিন। স্বভাবতই মানুষ সামাজিক জীবনে অভ্যস্ত। দৈনন্দিন চলার পথে তাকে বারবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে সত্য-মিথ্যার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। এমন চ্যালেঞ্জ একবারই আসে না জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে বারবার নতুনভাবে আসে।
তথ্যের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও সত্যের অভাব দেখা দেয়; সম্পর্কের বিস্তার ঘটলেও হৃদ্যতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়। বাহ্যিক উন্নতির চূড়ায় পৌঁছানোর দৃশ্য চোখে পড়লেও ভেতরে ভেতরে আত্মিক অবক্ষয় দ্রুত বাড়তে থাকে।
এই বৈপরীত্যপূর্ণ বাস্তবতায় একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কীভাবে নিজের ঈমানকে দৃঢ় ও অটুট রাখা যায়।
হযরত মোহাম্মদ (সা.) বহু আগেই এ সময়ের ভবিষৎবাণী করে গেছেন। হাদিস মতে, ‘মানুষ সকালে মুমিন থাকবে, বিকেলে কাফির হয়ে যাবে; আবার বিকেলে মুমিন থাকবে, সকালে কাফির হয়ে যাবে। সে দুনিয়ার সামান্য স্বার্থের বিনিময়ে নিজের দ্বীন বিক্রি করে দেবে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১১৮)
এই হাদিস বর্তমান বাস্তবতার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। ঈমান আজ আর শুধু বিশ্বাসের নাম নয়, এটি হয়ে উঠেছে সংগ্রামের আরেক নাম।
পবিত্র কোরআনে আমাদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দাও, প্রস্তুত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ২০০)
ফিতনার সময় ঈমান রক্ষা করতে হলে কয়েকটি গুণ অর্জন করা অপরিহার্য, নিম্নে সেগুলোর কয়েকটি তুলে ধরা হলো;
সবর ও স্থিরতা:
কারণ ফিতনা কখনো হঠাত্ আঘাত করে না; এটি ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও আমলকে গ্রাস করে। তাই প্রতিরোধও হতে হবে সচেতন ও ধারাবাহিক।
ইলম বা সঠিক জ্ঞান:
অজ্ঞতা ফিতনার সবচেয়ে বড় খাদ্য। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অন্তর থেকে ইলম উঠিয়ে নেন না, কিন্তু দ্বীনের আলিমদের উঠিয়ে নেয়ার ভয় করি। যখন কোনো আলিম অবশিষ্ট থাকবে না তখন লোকেরা মূর্খদেরকেই নেতা বানিয়ে নিবে। তাদের জিজ্ঞেস করা হলে না জানলেও ফাতাওয়া প্রদান করবে। ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে, এবং অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবে।’ (বুখারি, হাদিস: ১০০)
আজকের বিভ্রান্তির যুগে কোরআন ও সহিহ হাদিসভিত্তিক জ্ঞান অর্জন ছাড়া ঈমান টিকিয়ে রাখা কঠিন। কারণ মিথ্যা আজ যুক্তির ভাষায় আসে, আর সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে।
সৎ সঙ্গ:
মানুষ একা ঈমান ধরে রাখতে পারে না। ভালো পরিবেশ, দ্বীনদার বন্ধু এবং আলেমদের সংস্পর্শ ঈমানকে শক্ত রাখে। আল্লাহ বলেন: ‘তুমি নিজেকে তাদের সঙ্গেই রাখো, যারা সকাল-সন্ধ্যা তাদের রবকে ডাকে।’ (সুরা কাহফ, আয়াত : ২৮)
দোয়া ও আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক:
ফিতনার সময় বাহ্যিক শক্তি নয়, অন্তরের শক্তিই মানুষকে টিকিয়ে রাখে। রাসুল (সা.) অধিক পরিমাণে দোয়া করতেন, ‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনের ওপর দৃঢ় রাখো।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২১৪০)
দুনিয়ার মোহ থেকে নিজেকে সংযত রাখা:
ফিতনার একটি বড় উত্স হলো দুনিয়াবিমুখতার অভাব। যখন দুনিয়া লক্ষ্য হয়ে যায়, তখন দ্বীন আপসের বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। অথচ পবিত্র কোরআন স্পষ্টভাবে বলে: ‘দুনিয়ার জীবন তো প্রতারণার সামান্য ভোগ ছাড়া কিছুই নয়।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫)
আমাদের বুঝতে হবে:
ফিতনা এড়ানো সব সময় সম্ভব নয়, কিন্তু এর মধ্যে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব। আর এ রক্ষার মূল চাবিকাঠি হলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক, সঠিক জ্ঞান, ধৈর্য ও সত্ সঙ্গ।
এই অন্ধকার সময়েও আশা নিভে যায়নি। কারণ মহান আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং সত্কর্মপরায়ণ।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ১২৮)
কাজেই চারপাশের ঝড় যতই তীব্র হোক, একজন মুমিনের হূদয়ে যেন ঈমানের প্রদীপ জ্বলে থাকে। কারণ এই আলোই একদিন তাকে সব অন্ধকার পেরিয়ে চিরস্থায়ী নাজাতের পথে পৌঁছে দেবে।
দোয়া ও আশ্রয় প্রার্থনা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে বিশেষভাবে আশ্রয় চাইতেন। ফিতনার অনিষ্ট থেকে বাঁচতে নিম্নোক্ত দোয়াগুলো পাঠ করা যেতে পারে:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জীবন ও মরণকালীন ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই)।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْفِتَنِ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই)।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সব ধরনের ফিতনা থেকে মুক্ত থেকে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর দেখানো পথ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমীন




Comments