পবিত্র ঈদুল আজহা সমাগত। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখের মধ্যে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমের ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব বা অবশ্য পালনীয়। তবে কার ওপর কুরবানি ওয়াজিব এবং এর শর্তগুলো কী—তা নিয়ে অনেকের মনেই জিজ্ঞাসা থাকে।
কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্তাবলি:
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে একজন ব্যক্তির ওপর কুরবানি বাধ্যতামূলক হয়।
শর্তগুলো হলো:
১. মুসলিম হওয়া: কুরবানি কেবল মুসলিমদের ওপরই ওয়াজিব।
২. প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্ক: ব্যক্তিকে অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক (বালিগ) ও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ওপর কুরবানি ওয়াজিব নয়।
৩. মুকিম বা স্থায়ী বাসিন্দা: কুরবানির দিনগুলোতে যিনি নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন (মুকিম), তার ওপর এটি ওয়াজিব। শরিয়ত নির্ধারিত মুসাফির বা ভ্রমণকারীর ওপর কুরবানি ওয়াজিব নয়।
৪. নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া: এটি কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার প্রধান আর্থিক শর্ত।
নিসাব ও সম্পদের পরিমাণ:
কুরবানির নিসাব হলো—স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি অথবা রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বাহান্ন (৫২.৫) ভরি। বর্তমান সময়ে রুপার দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় রুপার পরিমাণকেই নিসাব হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ, জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোনো ব্যক্তির কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ ও ঋণ বাদে সাড়ে বাহান্ন ভরি রুপার মূল্যের সমপরিমাণ নগদ টাকা, ব্যবসার পণ্য বা অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র থাকলে তাকে অবশ্যই কুরবানি দিতে হবে।
জাকাত ও কুরবানির পার্থক্য:
অনেকেই জাকাতের নিসাবের সঙ্গে কুরবানিকে গুলিয়ে ফেলেন। মূল পার্থক্য হলো—জাকাতের ক্ষেত্রে নিসাব পরিমাণ সম্পদ টানা এক বছর নিজের কাছে থাকা শর্ত। কিন্তু কুরবানির ক্ষেত্রে জিলহজ মাসের ওই তিন দিনের যেকোনো সময় নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকলেই কুরবানি ওয়াজিব হবে।
পরিবার ও ঋণগ্রস্তদের নিয়ম:
পরিবারের কর্তা কুরবানি দিলেই সবার পক্ষ থেকে আদায় হবে না যদি পরিবারের অন্য সদস্যদের (যেমন স্ত্রী বা প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান) নামে আলাদাভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে। সেক্ষেত্রে তাদের প্রত্যেকের ওপর আলাদাভাবে কুরবানি ওয়াজিব। তবে যদি কারো নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে কিন্তু ঋণের পরিমাণও অনেক বেশি হয় (ঋণ শোধ করলে নিসাব থাকে না), তবে তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব হবে না।
কুরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত:
কুরবানির মাহাত্ম্য সম্পর্কে উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "কুরবানির দিনে পশুর রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে আল্লাহর কাছে প্রিয় আর কোনো আমল নেই। পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর দরবারে তা কবুল হয়ে যায়।"
হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) বর্ণিত অন্য একটি হাদিসে এসেছে, সাহাবায়ে কেরাম কুরবানির সওয়াব সম্পর্কে জানতে চাইলে নবীজি (সা.) বলেন, "কুরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে।"
পবিত্র কুরবানি কেবল পশু জবাই নয়, বরং এটি হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নতের অনুসরণ এবং মহান আল্লাহর প্রতি চরম আনুগত্য ও ত্যাগের এক অনন্য মহিমা।




Comments