Image description

টানা দুই বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর অবশেষে আবারও নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে জার্মানি। আর এই সাফল্যের পেছনে অন্যতম বড় ভূমিকা রেখেছেন ডেনিজ উন্দাভ। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ২-১ গোলের গুরুত্বপূর্ণ জয়ে জোড়া গোল করে তিনি হয়ে উঠেছেন জার্মানদের নতুন নায়ক।

আজকের এই উন্দাভকে দেখে বোঝার উপায় নেই, একসময় জীবিকার তাগিদে তাকে প্রতিদিন আট ঘণ্টা কারখানায় কাজ করতে হতো। ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতেন, তারপর ছুটতেন অনুশীলনে। দিনের শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যেত। কঠোর পরিশ্রম আর সংগ্রামের সেই দিনগুলো এখন অতীত হলেও, সেগুলোই তাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।

বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক মাস আগেও জার্মান দলে তার জায়গা পাওয়া নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা। এমনকি জাতীয় দলের কোচ জুলিয়ান নাগেলসমানের সঙ্গে তার প্রকাশ্য মতবিরোধও হয়েছিল। এক ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে শেষ মুহূর্তে গোল করার পর উন্দাভ বলেছিলেন, তিনি শুরুর একাদশে খেলার যোগ্য। এর জবাবে নাগেলসমান মন্তব্য করেছিলেন, শুরু থেকেই খেললে হয়তো সেই গোলটি করতে পারতেন না উন্দাভ।

তবে সমালোচনা বা বিতর্কে থেমে থাকেননি তিনি। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে মাঠেই নিজের জবাব দিয়েছেন। জোড়া গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করার পর কোচ নাগেলসমানও স্বীকার করেছেন, উন্দাভকে শুরুর একাদশে রাখার বিষয়টি এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “দুই ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে দুই ম্যাচেই গোল করেছে। তার ছন্দ নষ্ট করার কোনো কারণ নেই। তবে পরবর্তী ম্যাচে তাকে শুরু থেকেই খেলানো হতে পারে।”

তবে উন্দাভের জীবনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক গল্পটি মাঠের বাইরের। মাত্র ১৪ বছর বয়সে জার্মান ক্লাব ভের্ডার ব্রেমেনের পক্ষ থেকে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার শারীরিক গঠন ছোট হওয়ায় ফুটবলে তার ভবিষ্যৎ নেই। সেই প্রত্যাখ্যান যেকোনো কিশোরের স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারত। কিন্তু উন্দাভ হার মানেননি।

নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলার সংকল্প নিয়ে তিনি এগিয়ে যান। ১৭ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে জার্মানির চতুর্থ বিভাগের ক্লাব হাভেলসেতে যোগ দেন। সেখানে সপ্তাহে পেতেন মাত্র ১২০ পাউন্ড। সেই অর্থে জীবনযাপন সম্ভব না হওয়ায় তাকে কারখানায় কাজ করতে হতো।

এক সাক্ষাৎকারে উন্দাভ নিজের সংগ্রামের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন, “ভোর চারটার দিকে ঘুম থেকে উঠতাম। কারখানায় কাজ করতাম, তারপর অনুশীলনে যেতাম। রাত আটটার দিকে বাড়ি ফিরতাম। পরদিন আবার একই রুটিন। বেঁচে থাকার জন্যই এই কাজ করতে হয়েছে। শুধু ফুটবল খেলে পাওয়া টাকায় চলা সম্ভব ছিল না।”

২০২০ সালে বেলজিয়ামের ক্লাব ইউনিয়ন সেন্ট-জিলোয়াজে যোগ দেওয়ার পর তার জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করে। ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ইউরোপীয় ফুটবলে। আর এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে জার্মানির জার্সিতে গোল করে তিনি প্রমাণ করছেন, কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস থাকলে কোনো স্বপ্নই অধরা থাকে না।

কারখানার শ্রমিক থেকে বিশ্বকাপের নায়ক—ডেনিজ উন্দাভের গল্প যেন সংগ্রাম, প্রত্যয় ও সাফল্যের এক অনন্য উদাহরণ।