পড়ার টেবিলে বই, স্কুল ব্যাগ রয়েছে আজও। ড্রেসিং টেবিলের এক কোণে অবহেলায় পড়ে আছে তোমার ফেলে যাওয়া সেই লিপস্টিকটা। রঙটা ঠিক আগের মতোই উজ্জ্বল, শুধু সেটা ঠোঁটে ছোঁয়ানোর মানুষটাই আজ কতদূরে! বলছিলাম-রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণ ও নির্মাম হত্যাকাণ্ডের শিকার ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারের কথা।
জাতি আজ শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের কলঙ্কের চাপায় পিষ্ট। সরকার প্রধান, যিনি নিজেও একজন কন্যা সন্তানের বাবা- তিনিও হতভম্ব। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শিশু রামিসা আক্তারকে হত্যার আগে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে অভিযুক্ত সোহেল রানা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক ওহিদুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, সোহেল ওই শিশুকে টয়লেটে নিয়ে প্রথমে ধর্ষণ করে এবং পরবর্তীতে ঘটনা ধামাচাপা দিতে তাকে নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকান্ডের পর পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় এবং তাকে আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর যৌথ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ৮৫ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই আক্রান্ত শিশুদের বয়স চার থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে একক ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৪ জন শিশু, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২২ জন শিশু এবং ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে ৯ জন শিশুকে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই ৮৫টি ঘটনার একটিতেও এখন পর্যন্ত কোনো অপরাধীর সাজা হওয়া তো দূরের কথা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দানেই চরম গড়িমসি করা হচ্ছে।
আইন অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা প্রাপ্তির নির্দিষ্ট কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার বাধ্যবাকতা থাকলেও বাস্তবে এই মামলাগুলোর সিংহভাগই এখনো প্রাথমিক তদন্ত, মেডিকেল রিপোর্টের জটিলতা এবং থানা পুলিশের গাফিলতির বেড়াজালে আটকে আছে। ফলে, অপরাধীরা প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে অথবা জামিনে বেরিয়ে এসে ভুক্তভোগী পরিবারকে মামলা তুলে নেয়ার জন্য অনবরত হুমকি দিচ্ছে।
৮৫টি ঘটনার বিপরীতে মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শতভাগ ঘটনায় থানায় এজাহার বা মামলা দায়ের সম্ভব হয়নি। সামাজিক লোকলজ্জা এবং প্রভাবশালীদের চাপের মুখে বেশ কিছু ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। তবে যে ৭৫টি মামলা দেশের বিভিন্ন থানায় ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে নথিভুক্ত হয়েছে, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত হতাশাজনক। এর মধ্যে ৬০টিরও বেশি মামলা এখনো প্রাথমিক তদন্ত এবং পুলিশি চার্জশিট গঠনের অপেক্ষায় ঝুলে আছে। বাকি ১৫টি মামলা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় উঠলেও তা বিচারাধীন বা শুনানির অপেক্ষায় দিন গুনছে।
এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির পেছনে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে কোর্ট প্রাঙ্গণের ভেতরের এক নির্মম বাস্তবতা। আসামিদের পক্ষে এবং বিশেষ করে অপরাধীদের পক্ষে যেসব আইনজীবীরা আইনি লড়াই পরিচালনা করেন, তাদের মন-মানসিকতা ও নৈতিকতা নিয়ে এখন জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আইনজীবী পেশার মূল ভিত্তি হলো আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন সাজা না পায় তা দেখা। কিš‘ শিশু ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর মামলায় অনেক সময় দেখা যায়, আইনজীবীরা মোটা অঙ্কের ফি’র বিনিময়ে অপরাধীকে নির্দোষ প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। আদালতে জেরা করার নামে ভুক্তভোগী শিশু বা তার পরিবারের ওপর যে মানসিক নির্যাতন চালানো হয়, তা অনেক সময় মূল অপরাধের চেয়েও কম নিষ্ঠুর নয়।
কেন গত দুই মাসে এতগুলো শিশু ধর্ষণের একটিরও বিচার হলো না? এর পেছনে রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা দায়ী বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। তাদের মতে, বাংলাদেশে কোনো কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষা আইন নেই, যার ফলে শিশু ধর্ষণের মামলায় স্থানীয় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক আশ্রয়পুষ্ট আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে এসে সাক্ষ্য দিতে সাধারণ মানুষ ভয় পান। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এই সুযোগটি পুরোপুরি নেন এবং তারা বারবার সময় চেয়ে মামলা দীর্ঘায়িত করেন, যার ফলে একসময় সাক্ষীরা আদালতে আসা বন্ধ করে দেন। এর পাশাপাশি ধর্ষণের ঘটনার পর দ্রুততম সময়ে মেডিকেল পরীক্ষা এবং ডিএনএ প্রোফাইলিং করা বাধ্যতামূলক হলেও ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে ল্যাবরেটরির সীমাবদ্ধতার কারণে এই রিপোর্ট আসতে মাসের পর মাস সময় লেগে যায়। ততদিনে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা প্রমাণের অভাব দেখিয়ে আসামির জামিন করিয়ে নেন।
তাছাড়া সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলোর ওপর হাজার হাজার মামলার চাপ রয়েছে। প্রতি জেলায় সীমিত সংখ্যক ট্রাইব্যুনাল দিয়ে এই বিপুল সংখ্যক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যার ফলে নতুন মামলাগুলো শুনানির তালিকায় উঠতেই হিমশিম খাচ্ছে।
এ বিষয়ে আইনজ্ঞ, অপরাধ বিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান (ক্রিমিনোলজি) বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শাহরিয়ার আমিন এই বিচারিক স্থবিরতা ও অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘শিশু ধর্ষণের মামলার বিচারে এই যে দীর্ঘসূত্রিতা, তা অপরাধীদের এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অভয়ারণ্য তৈরি করে দিচ্ছে। অপরাধ সংঘটন ও বিচার পাওয়ার মধ্যকার সময়ের ব্যবধান যত বাড়বে, সমাজ থেকে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ততটাই বিলুপ্ত হবে। আইনজীবীদের পেশাগত সুরক্ষার আড়ালে নৈতিকতাবিরোধী এই চর্চা এবং অপরাধীদের ছাড় দেয়ার প্রবণতা সমাজে এক ধরনের কালচার অব ইম্পিউনিটি বা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে, যা অপরাধের পুনরাবৃত্তির প্রধান কারণ।’
__এআর/এমকে




Comments