ড্যাপ লঙ্ঘন ও সরকারি খাল দখলের অভিযোগে স্বদেশ প্রোপার্টিজের ওপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা
রাজধানীর উত্তরখান ও খিলক্ষেত থানাধীন বাওথার মৌজায় সরকারি বোয়ালিয়া খাল দখল, অবৈধ বেইলি ব্রিজ নির্মাণ এবং ড্যাপ (২০২২-২০৩৫)-এর বিধান অমান্য করে ফসলি জমি ও জলাশয় ভরাটের অভিযোগে ‘স্বর্ণালী আবাসন’ প্রকল্পের বালু ভরাট কার্যক্রমের ওপর ৬ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে।
রোববার (১ জুন) হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি মো. আশিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিটের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট রাফসান আল আলভী ও অ্যাডভোকেট রুশো মোস্তফা। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শাদিয়া আফরিন শাপলা, সাইফুজ্জামান এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. গোলাম রাজিব, আরিফুল আলম ও এস.এম. আরিফুল ইসলাম।
আদালত সূত্রে জানা যায়, উত্তরখান থানাধীন বরুয়া এলাকার বাসিন্দা মোঃ দেলোয়ার হোসেন দেওয়ান স্থানীয় পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় হাইকোর্টে এই রিট পিটিশনটি দায়ের করেন। রিট আবেদনে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ কর্তৃক গত বছরের ৩০ জুন জারিকৃত একটি অত্যন্ত বিতর্কিত স্মারকের ওপর ভর করে স্বদেশ প্রোপার্টিজ লিমিটেড বোয়ালিয়া খালের ওপর অবৈধভাবে বেইলি ব্রিজ নির্মাণের সুযোগ পায়। মূলত এই বেইলি ব্রিজটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কোম্পানিটি খালের ওপারে থাকা বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পরিবেশ ধ্বংসের মরণকামড় বসায়।
আবেদনের তথ্য অনুযায়ী, স্বর্ণালী আবাসন প্রকল্পের নামে ড্রেজার ব্যবহার করে দিন-রাত সমানতালে উত্তরখান, দক্ষিণখান, বাওথার ও বরুয়া মৌজার বিস্তীর্ণ নিচু কৃষিজমি, বোরো ফসলি জমি, ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমি এবং মাছের ঘের জোরপূর্বক বালু দিয়ে ভরাট করা হচ্ছিল। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় বন্যা প্রবাহ অঞ্চল এবং প্রাকৃতিক জলাশয় হিসেবে চিহ্নিত এলাকাগুলোকেও রেহাই দেয়নি স্বদেশ প্রোপার্টিজ। এই ব্রিজ ও আবাসন প্রকল্পের বাহানায় সরকারি জলাধার দখল করার পাশাপাশি আশপাশের সাধারণ জমির মালিকদের ওপরও নেমে এসেছে নির্যাতন। জোরপূর্বক ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে প্রবেশ এবং কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ায় ইতোমধ্যে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা নিজেদের পৈতৃক জমিতে যাতায়াতেও বাধার মুখে পড়েছেন।
প্রকৃতি ও জীবিকা ধ্বংসের এই মহোৎসব বন্ধে স্থানীয় প্রায় তিন হাজার ভুক্তভোগী বাসিন্দা গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছিলেন। সর্বশেষ গত ২৬ এপ্রিল পরিবেশ অধিদপ্তর ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে আবারও আকুতি জানানো হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে আবাসন কোম্পানির অবৈধ স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসন সম্পূর্ণ অন্ধ ও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হন সংক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা।
আদালত দ্বিপাক্ষিক শুনানি শেষে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্বদেশ প্রোপার্টিজ লিমিটেডকে আগামী ৬ মাসের জন্য উত্তরখান মৌজার আর.এস দাগ নং ৬৬২২ ও ৬৬৩৩; দক্ষিণখান মৌজার আর.এস দাগ নং ১৩৫৩০-১৩৫৪৬; বাওথার মৌজার আর.এস দাগ নং ২৮০-৩১১ ও ৬০১-৬৩৭ এবং বরুয়া মৌজার আর.এস দাগ নং ১৬০৪-১৬১৬-এর জমিগুলোতে ড্রেজার বা অন্য কোনো উপায়ে বালু ভরাট কার্যক্রম পরিচালনা করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। একই সাথে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিবাদীদের ওপর নোটিশ জারির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আবেদনকারী পক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই রিট মামলায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ সচিব, রাজউক চেয়ারম্যান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, রাজউকের সদস্য (পরিকল্পনা), রাজউকের পরিচালক (অডিট ও বাজেট), পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক, রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ, ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি), ক্যান্টনমেন্ট রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি), খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং স্বদেশ প্রোপার্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ মোট ১২ জনকে বিবাদী করা হয়েছে।




Comments