Image description

জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প ঘিরে সাবেক মেজর জেনারেল আবু মো. সাঈদ মাসুদের বিরুদ্ধে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া এ অভিযোগ তুলে তিনি দেশের সেনাবাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

জিম্মি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, জলসিঁড়ি প্রকল্পে সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্লট রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হলেও আশিয়ান গ্রুপকে তাদের প্রাপ্য অর্থ এখনো পরিশোধ করা হয়নি। আশিয়ান গ্রুপকে ৫৫১ কোটি টাকা দেওয়া হলেও আমাকে জিম্মি করে সেই ৫৫১ কোটি টাকাসহ গ্রুপের প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ছিনিয়ে নেন সাবেক মেজর জেনারেল আবু সাঈদ মোঃ মাসুদ।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২০১২ সালে বিমানবন্দরে তাকে আটকে পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। পরে জলসিঁড়ি প্রকল্প কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে চোখ বেঁধে ‘আয়নাঘরে’ আটকে রেখে অমানবিক মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আশিয়ান গ্রুপের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও হিসাব বিভাগের কর্মীদের ভয় দেখিয়ে ইসলামী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও এবি ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা জোরপূর্বক তুলে নেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভূঁইয়াকে জিম্মি করে জমি দখল ও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনায় তৎপরতা শুরু করতেই সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য, বর্তমান নির্বাচন কমিশনার সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ অভিযুক্ত সাবেক মেজর জেনারেল আবু মোহাম্মদ সাঈদ মাসুদের লুটপাটের অর্থ বাঁচাতে তৎপরতা শুরু করেছে। 

অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনার সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ, একটি সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা আকবর এবং সাবেক মেজর জেনারেল আবু মো. সাঈদ মাসুদের নেতৃত্বে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ‘আয়না ঘর’-এ নিয়ে অসংখ্য শিল্পপতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে গুম-খুন ও নির্যাতন করা হয়েছে। 

বিশেষ সূত্রের দাবি, সাবেক মেজর জেনারেল সাঈদ মাসুদের অপকর্ম থেকে আসা দুর্নীতির টাকার একটি বড় অংশের ভাগ পেতেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। একই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা আকবরের নেতৃত্বে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভূঁইয়াকে দীর্ঘদিন ধরে হয়রানি, চাপ প্রয়োগ ও জিম্মি করে রাখা হয়। এই হয়রানির মূলে ছিল জলসিড়ি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নে আশিয়ান গ্রুপের বিনিয়োগ করা টাকা না দেয়া। পাশাপাশি আশিয়ান গ্রুপের ক্রয়কৃত জমি দখল করা।

সূত্রমতে, আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যানকে আয়না ঘরে জিম্মি করে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার বিপুল অর্থ আত্মসাতের ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার নোংরা অপচেষ্টা চালাচ্ছে একটি সিন্ডিকেট। এই চক্র সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ভুল, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট তথ্য পাঠিয়ে তাদের বিব্রত ও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। ইমেইলের মাধ্যমে অসত্য তথ্য ছড়িয়ে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যানকে সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর বৃথা প্রয়াস চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই অপতৎপরতার নেপথ্যে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ, সাবেক মেজর জেনারেল আবু মোঃ সাঈদ মাসুদ এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তা আকবরসহ একটি চক্রের বিরুদ্ধে। আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান সেনাবাহিনীর সম্মানিত কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আপনারা সতর্ক থাকুন। এই সিন্ডিকেট ভিত্তিহীন ও অসত্য তথ্য দিয়ে আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। কোনো অবস্থাতেই এসব মিথ্যা ইমেইল বা তথ্যকে গুরুত্ব দেবেন না। আশিয়ান গ্রুপ সবসময় দেশ ও জাতির পাশে ছিল, আজও আছে। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল রয়েছি।”

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ, সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আকবর ও সাবেক মেজর জেনারেল আবু মো. সাঈদ মাসুদের দুর্নীতির টাকা যথাযথ অনুসন্ধান করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারকে সহযোগিতা করে গুম-খুন, নির্যাতন ও ‘আয়না ঘর’ কাণ্ড বাস্তবায়নে জড়িতদের বিচার করা বর্তমান সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।

বন্ধকী জমি ও আইনি জটিলতা

জলসিঁড়ি প্রকল্পের ১২০০ বিঘা জমি ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা হয়েছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে সেই বন্ধকী জমি সেনা সদস্যদের নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, “জলসিঁড়ি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশের কোনো আবাসন প্রতিষ্ঠান সাহস করেনি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি আমার অগাধ আস্থা থেকে এলাকাবাসীকে বুঝিয়ে এবং নিজ অর্থায়নে জমি ক্রয় করে প্রকল্পটি সফল করি। কিন্তু তৎকালীন জলসিড়ি প্রকল্পের চেয়ারম্যান সাঈদ মাসুদ তার ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সাধারণ সেনা কর্মকর্তাদের ভুল বুঝিয়ে আশিয়ান গ্রুপের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেয়। ফলে আশিয়ান গ্রুপ ও সাধারণ সেনা সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। 

সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা ও বিচার প্রার্থনা

আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান দাবি করেন, সেনাবাহিনীর ৮০ শতাংশ অফিসার তার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও সততার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। অনেক সাবেক সেনা কর্মকর্তা বর্তমানে আশিয়ান গ্রুপের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, “সাবেক মেজর জেনারেল সাঈদ মাসুদ আমাকে আয়নাঘরে বন্দি করে ছিনিয়ে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা, যা উদ্ধারে আমাকে সহায়তা করুন। আমার বিশ্বাস দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তির অপকর্মের দায় নেবে না এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তকে তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে।”

নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া আরও অভিযোগ করেন, সাবেক মেজর জেনারেল আবু সাঈদ মো. মাসুদ ও তার সিন্ডিকেট অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আশিয়ান সিটির দেড় হাজার বিঘা জমি বন্ধক রেখে কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ তুলে নিয়েছে। আশিয়ান গ্রুপ এই ঋণের এক কানাকড়িও ভোগ করেনি, বরং বিশাল ঋণের বোঝা বইতে হচ্ছে। পাশাপাশি আশিয়ান গ্রুপের ক্রয়কৃত ১২০০ বিঘা জমি জবরদখল করে জলসিঁড়ি-২ প্রকল্প নির্মাণ করা হচ্ছে।

তিনি জানান, এই সিন্ডিকেটে সাবেক আরও কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা জড়িত। তাদের নাম পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করে আইনের আওতায় আনা হবে।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ন্যায়বিচারের আশা

নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, “বিগত ১৭ বছর বাংলাদেশে আইনের শাসন ছিল না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে থানায় মামলা দিতে গেলেও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ৫ই আগস্ট আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর প্রতিকূল পরিবেশের অবসান ঘটেছে। আমি আশা করি, আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা উদ্ধারে বর্তমান ও সাবেক সেনা সদস্যরা ভূমিকা রাখবেন।

এদিকে, অভিযোগ রয়েছে যে সাবেক মেজর জেনারেল আবু সাঈদ মো. মাসুদ দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ লন্ডনে তার পরিবারের কাছে পাচার করেছেন। এছাড়া নিয়মবহির্ভূতভাবে কয়েক হাজার বিঘা সরকারি জমি দখল করে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পকে দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

উল্লেখ্য, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে অবৈধ অর্থসহ আত্মগোপনের চেষ্টার অভিযোগে ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত সাঈদ মাসুদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

মানবকণ্ঠ/ডিআর