চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সাভারের আশুলিয়ায় নির্বিচারে মানুষ হত্যা ও লাশ পোড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহিল কাফির পাসপোর্ট প্রাপ্তির ঘটনাটি ছিল চরম নাটকীয়তায় ভরা। মাত্র ৯ দিনের ব্যবধানে তার নামে তিনটি ভিন্ন পাসপোর্ট ইস্যু করেছে আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিস। খুনি কাফিকে বাঁচাতে তার আসল পরিচয় গোপন করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেডিকেল স্প্রেম্যান সুপারভাইজার সাজিয়ে জাল নথিপত্র তৈরি করেন উপপরিচালক ইসমাইল হোসেন। তার সরাসরি নির্দেশ ও সহযোগিতায় অধিদপ্তরের একটি চক্র মাত্র ৯ দিনে ৩টি পাসপোর্ট ইস্যু করে কাফিকে দেশত্যাগের সুযোগ করে দেওয়ার মিশনে নামে।
কেবল আব্দুল্লাহিল কাফিই নন, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর আত্মগোপনে থাকা তৎকালীন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও তার স্বামীকেও গোপনে পাসপোর্ট ইস্যু করে দিয়েছেন এই ইসমাইল গং। এছাড়া আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের পাসপোর্টও তাদের হাত ধরেই বের হয়েছে। এভাবে ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রভাবশালী নেতা ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দিতে জাল জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে পাসপোর্ট বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই সিন্ডিকেট। ‘মানকণ্ঠের’ দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আব্দুল্লাহিল কাফিকে সাধারণ নাগরিক প্রমাণ করতে ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ২৩ আগস্টের মধ্যে আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিস থেকে তিনটি পৃথক পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়। ১৫ আগস্ট ৪০০০০০১২৩৪৯২৬ ক্রমিকে সাধারণ আবেদন জমা দেওয়া হয় এবং ২০ আগস্ট তার নামে প্রথম পাসপোর্ট (এ০৮৭৫৭০৪৬) ইস্যু হয়। কিন্তু সেটি ডেলিভারি নেওয়ার আগেই ১৮ আগস্ট দ্বিতীয় আবেদনের (৪০০০০০১২৩৫৪৯২) প্রেক্ষিতে ২১ আগস্ট আরও একটি পাসপোর্ট (এ০৮৭০৯৫৫৭) তৈরি করা হয়। ওইদিনই উপপরিচালক ইসমাইল হোসেনের সরাসরি তদারকিতে তৃতীয় আবেদন (৪০০০০০১২৩১৭৫৫) জমা নিয়ে মাত্র দুই দিনের মাথায় ২৩ আগস্ট তৃতীয় পাসপোর্টটি (এ০৮৭১২১২৬) কাফির হাতে তুলে দেওয়া হয়। এই পাসপোর্ট ব্যবহার করেই গত ২ সেপ্টেম্বর কাফি বিদেশে পালানোর চেষ্টা করেন, তবে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে ডিবির হাতে ধরা পড়েন তিনি।
গত ২২ সেপ্টেম্বর সাবেক প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের পাসপোর্ট প্রদান করে আগারগাঁও অফিস। এছাড়া সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও তার স্বামীর ক্ষেত্রে কোনো দাপ্তরিক চিঠি ছাড়াই ‘মোবাইল এনরোলমেন্টের’ মাধ্যমে ছবি তোলার ব্যবস্থা করে দেন ইসমাইল হোসেন। অথচ ওই সময় প্রধান উপদেষ্টার ছবি সংগ্রহের জন্য অধিদপ্তরে অফিশিয়াল চিঠি চালাচালির প্রয়োজন হয়েছিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপপরিচালক ইসমাইল হোসেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিএস মালেকের ভাগ্নি জামাই। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একজন উপপরিচালক হয়েও তিনি পরিচালকের চেয়ার দখল করে আছেন। ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পিএস মনির ও মন্ত্রীর ছেলে জ্যোতির সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে বদলি ও তদ্বির বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। ঢাকার ভেতরে ও বাইরে তার নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও বিপুল পরিমাণ জমির শেয়ার রয়েছে। তার ব্যাংক হিসাব ও আয়কর রিটার্নেও ব্যাপক গরমিল পাওয়া গেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে গেলে উপপরিচালক ইসমাইল হোসেন দেখা করেননি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার পিএস-এর কাছে প্রশ্ন রেখে যান, পরে উত্তর দেবো।’ তবে তার পিএস লিখিত প্রশ্ন গ্রহণ করলেও কোনো ‘রিসিভ কপি’ বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র দিতে রাজি হননি। ফলে দাপ্তরিকভাবে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments