Image description

জনপ্রশাসনে বড় ধরনের পদোন্নতির পরও কাটছে না অস্বস্তি ও জট। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সম্প্রতি উপসচিব থেকে যুগ্মসচিব পদে ১৭৯ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। তবে এই পদোন্নতির আনন্দের চেয়েও প্রশাসনের অন্দরে এখন হতাশা ও অসন্তোষ বেশি দৃশ্যমান। একদিকে পদোন্নতি পেয়েও ৫৬৬ জন কর্মকর্তা কোনো পদ বা ‘চেয়ার’ পাচ্ছেন না, অন্যদিকে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অন্তত দেড় শতাধিক কর্মকর্তা পদোন্নতি থেকে বাদ পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুগ্মসচিবের অনুমোদিত স্থায়ী পদ রয়েছে ৫০২টি। নতুন ১৭৯ জনের পদোন্নতির আগে এই পদে কর্মরত ছিলেন ৮৮৯ জন কর্মকর্তা। নতুনদের যোগদানের পর এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৮ জনে, যা অনুমোদিত পদের দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে পদোন্নতি পাওয়া অধিকাংশ কর্মকর্তাকেই আপাতত আগের কর্মস্থলে ‘ইনসিটু’ (নিচের পদে থেকে ওপরের পদের দায়িত্ব পালন) হিসেবে কাজ করতে হবে।

গত ৯ জুলাই রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রথম প্রজ্ঞাপনে দেশে কর্মরত ১৭২ জন উপসচিবকে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে এবং তাদের সরাসরি বা ই-মেইলে যোগদানপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপনে বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে কর্মরত ৭ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হলেও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলেই দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ রয়েছে, ভবিষ্যতে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিরূপ তথ্য বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে এই পদোন্নতির আদেশ সংশোধন বা বাতিল করার অধিকার সরকার সংরক্ষণ করবে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, “যাদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে, পদ বা চেয়ার তাদের প্রাপ্য। পদোন্নতি দিয়ে যদি কাজ না দেওয়া হয় বা আগের চেয়ারেই দায়িত্ব পালন করতে হয়, তবে কর্মকর্তারা উচ্চতর কাজ করার আগ্রহ ও মনোযোগ হারিয়ে ফেলবেন। যুগ্মসচিব পদটি সরকারের নীতিনির্ধারণী পদ, যেখানে সচিব বা ক্যাবিনেট সচিবের সঙ্গে সরাসরি কাজ করতে হয়। আর উপসচিব পদটি মূলত অধীনস্থ পদ। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনে এই ‘ইনসিটু’ পদ্ধতি চলে আসছে, সরকারের উচিত দ্রুত এর সুরাহা করা।”

ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতির সমীকরণ: ‘সরকারের উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে পদোন্নতি বিধিমালা, ২০০২’ অনুযায়ী, যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ প্রশাসন ক্যাডার এবং ৩০ শতাংশ অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিবেচনা করা হয়। এবারের নিয়মিত পদোন্নতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বিসিএস ২৫তম ব্যাচ; এই ব্যাচ থেকে সর্বোচ্চ ৯৪ জন কর্মকর্তা যুগ্মসচিব হয়েছেন। পাশাপাশি বিগত সরকারের সময়ে বঞ্চিত বিসিএস ২৪তম ব্যাচের ৪৬ জন কর্মকর্তা এবার তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। এছাড়া অতীতে বঞ্চিত বিসিএস ১৫ ও ২০তম ব্যাচের একজন করে কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন এবং বিভিন্ন ক্যাডারের বিভিন্ন ব্যাচের আরও ৩৭ জন কর্মকর্তা যুগ্মসচিব পদে উন্নীত হয়েছেন।

এবারের পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, রাজশাহীসহ ১০টি জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) রয়েছেন।

বঞ্চনা ও বৈষম্যের নতুন অভিযোগ: পদোন্নতির তালিকা প্রকাশের পরপরই জনপ্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নতুন করে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিসিএস ২৫তম ব্যাচের প্রায় ২০৪ জন কর্মকর্তা পদোন্নতির জন্য যোগ্য হলেও পদোন্নতি পেয়েছেন মাত্র ৯৪ জন; অর্থাত্ ১১০ জন কর্মকর্তা বাদ পড়েছেন। একইভাবে ২৪তম ব্যাচের প্রায় ১৮০ জন বঞ্চিত কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ৪৬ জনের ভাগ্য খুলেছে।

পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশের দাবি বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রীর পিএস কিংবা ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কারণেই তাদের এবার রাজনৈতিক বিবেচনায় বাদ দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বৈষম্য দূর করার প্রত্যাশা থেকেই তো গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও যারা আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পিএস বা ডিসি ছিলেন, তারা পদোন্নতি পেয়েছেন। তাহলে একই ধরনের দায়িত্ব পালন করার পরও এবার আমাদের কেন বাদ দেওয়া হলো? যদি একই বৈষম্য থেকে যায়, তবে পরিবর্তনের সুফল কোথায়?”

তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এই বৈষম্যের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যেসব কর্মকর্তা পদোন্নতির সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক যোগ্যতা পূরণ করেছেন, কেবল তাদেরই বিবেচনা করা হয়েছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, বিভাগীয় মামলা রয়েছে কিংবা বিগত সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করতে বা ফ্যাসিবাদকে সহযোগিতা করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাদের পদোন্নতির তালিকায় রাখা হয়নি।