চার বছর আগে কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম আরও উজ্জ্বল করেছিলেন লিওনেল মেসি। এবার ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আরেকটি ফাইনালের হাতছানির সামনে। তবে সেই স্বপ্নপূরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন। দুই মহাতারকার নেতৃত্বেই আজ বুধবার আটলান্টায় বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ফুটবলবিশ্বের চোখ এখন এই দুই অধিনায়কের দিকেই।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের লড়াই সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ১৯৮৬ সালের ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে শুরু করে অসংখ্য নাটকীয় মুহূর্ত— দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। এবার সেই ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় লিখতে নামছে লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা ও টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড। এই বিশ্বকাপে মেসির পারফরম্যান্স আবারও প্রমাণ করেছে কেন তাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে নকআউট— প্রতিটি ধাপেই গোল, অ্যাসিস্ট ও আক্রমণ তৈরিতে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে তার নেতৃত্বে ৩-১ ব্যবধানে জয় পেয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সেমিফাইনালে উঠেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
হ্যারি কেইনও নিজের সেরাটা উজাড় করে দিচ্ছেন। ডিআর কঙ্গো, মেক্সিকো ও নরওয়ের বিপক্ষে নকআউট পর্বে ইংল্যান্ডের সাফল্যে তার অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। গোল করার পাশাপাশি দলের আক্রমণ পরিচালনায়ও তিনি ছিলেন অনন্য। জুড বেলিংহাম, বুকায়ো সাকা ও ফিল ফোডেনদের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন দারুণ বোঝাপড়া। পরিসংখ্যানেও জমে উঠেছে দুই তারকার লড়াই। এই টুর্নামেন্টে মেসি গোলের পাশাপাশি সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রেও এগিয়ে আছেন। কেইন বক্সের ভেতরে সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতায় অন্যতম সেরা।
ফলে সেমিফাইনালে একজন হবেন সৃজনশীলতার প্রতীক, আরেকজন নিখুঁত ফিনিশারের। আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি ম্যাচের আগে বলেছেন, ইংল্যান্ডকে হারাতে হলে নিজেদের সেরাটা খেলতে হবে। তার বিশ্বাস, বড় ম্যাচে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তাই পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলও প্রতিপক্ষকে যথেষ্ট সম্মান দেখিয়েছেন। তার মতে, মেসিকে পুরোপুরি থামানো সম্ভব নয়, তবে দলগতভাবে তার প্রভাব কমিয়ে আনতে হবে।
একই সঙ্গে কেইন ও বেলিংহামের সমন্বয়ের ওপরও ভরসা রাখছেন তিনি। মধ্যমাঠের লড়াইও হবে দারুণ আকর্ষণীয়। আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও রদ্রিগো ডি পল বলের দখল ধরে রাখতে পারদর্শী। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের ডেকলান রাইস ও বেলিংহাম গতি, শক্তি ও প্রেসিংয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে সক্ষম। ফলে মাঝমাঠে যে দল আধিপত্য করবে, তারাই ম্যাচে এগিয়ে থাকবে। রক্ষণেও রয়েছে শক্তিশালী দুই ইউনিট। আর্জেন্টিনার ক্রিস্তিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে সামলাতে হবে কেইনকে। জন স্টোনস ও মার্ক গেহির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবেন মেসি, যিনি যে কোনো মুহূর্তে একক নৈপুণ্যে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।
সম্ভাব্য একাদশে আর্জেন্টিনা খেলতে পারে— এমিলিয়ানো মার্তিনেজ; নাহুয়েল মোলিনা, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো; রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার; লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজ। ইংল্যান্ডের সম্ভাব্য একাদশ, জর্ডান পিকফোর্ড; কাইল ওয়াকার, জন স্টোনস, মার্ক গেহি, লুক শ; ডেকলান রাইস, জুড বেলিংহাম; বুকায়ো সাকা, ফিল ফোডেন, অ্যান্থনি গর্ডন; হ্যারি কেইন।
বিশ্লেষকদের মতে, ম্যাচটি হতে পারে কৌশলের লড়াই। আর্জেন্টিনা বলের দখল ও ছোট ছোট পাসে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। ইংল্যান্ড দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক ও সেট-পিসকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। দুই দলই টুর্নামেন্টজুড়ে ধারাবাহিক ফুটবল খেলেছে, তাই সামান্য ভুলও নির্ধারণ করে দিতে পারে ফাইনালের ভাগ্য। তবে ম্যাচের আগে একটি বিতর্কও আলোচনায় এসেছে। আর্জেন্টিনার কয়েকটি ম্যাচে রেফারিং ও নতুন ভিএআর প্রোটোকল নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। যদিও দলটি এসব বিতর্ক পাশ কাটিয়ে নিজেদের লক্ষ্যেই মনোযোগী রয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, এই সেমিফাইনাল কেবল দুটি দেশের লড়াই নয়। এটি দুই প্রজন্মের দুই অসাধারণ অধিনায়কের নেতৃত্বেরও পরীক্ষা। একদিকে ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে আরেকটি শিরোপার স্বপ্ন দেখা লিওনেল মেসি, অন্যদিকে ইংল্যান্ডকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিশ্বকাপ জয়ের পথে এগিয়ে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হ্যারি কেইন। ফাইনালের টিকিট কার হাতে উঠবে, তার উত্তর মিলবে মাঠের ৯০ মিনিটে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বিশ্ব ফুটবল অপেক্ষা করছে মেসি ও কেইনের আরেকটি স্মরণীয় মহারণ দেখার জন্য।




Comments